যেভাবে দুই বিশ্ব তেলযুদ্ধ বদলে দিল বিশ্বের মানচিত্র

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পৃথিবীর মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কালো তরল পদার্থ শুধু সাধারণ কোনো জ্বালানি নয়; এটি ক্ষমতা, অর্থনীতি আর সাম্রাজ্য গড়ার মূল চাবিকাঠি। আধুনিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের মানচিত্র কীভাবে বারবার এই তেলের কারণে বদলে গেছে। প্রথম বাণিজ্যিক কূপ খনন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির উত্থান—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে এই তেল। ‘তেলের গল্প’ সিরিজের আজকের পর্বে আমরা জানব কীভাবে দুই বিশ্বযুদ্ধে তেলের লড়াই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করেছিল, কীভাবে বড় বড় করপোরেট শক্তির উদ্ভব হয়েছিল এবং কীভাবে এই তরল সম্পদ বিশ্বের মানচিত্র ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

বাকুর তেলজ্বর ও নোবেলদের উদ্ভাবন

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্ব তেলশিল্পে বড় ধরনের রদবদল শুরু হয়। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও কাস্পিয়ান সাগরের তীরের বাকু অঞ্চল নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে। ১৮৭২ সালে রুশ সাম্রাজ্য তেলের জমি ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দিলে নোবেল ভ্রাতৃদ্বয় সেখানে প্রবেশ করেন। তাঁরা শুধু টাকা বা পুঁজি নিয়ে আসেননি, নিয়ে আসেন আধুনিক বিজ্ঞান ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা। কূপ খনন, শোধন এবং পাইপলাইন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে তাঁরা বাকুর তেলকে অত্যন্ত সুসংগঠিত করে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে দেন। তাদের এই যুগান্তকারী কাজের জন্যই তাদের ‘রাশিয়ার রকফেলার’ বলা হতো।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

রথসচাইল্ড ও শেলের বিশ্বব্যাপী প্রসার

নোবেলদের পাশাপাশি ইউরোপের বিখ্যাত ফরাসি ব্যাংকিং পরিবার রথসচাইল্ডরাও বাকুর তেলশিল্পে বিশাল বিনিয়োগ করে। কিন্তু এই তেল সারা বিশ্বের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কাজটি করেন লন্ডনের ব্যবসায়ী মার্কাস স্যামুয়েল। তিনি সমুদ্রগামী বড় ট্যাংকার তৈরি করে সুয়েজ খাল দিয়ে এশিয়ায় তেল পাঠানো শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের নীল টিনের কেরোসিনের একচেটিয়া বাজার ভাঙতে তিনি লাল টিনে তেল বিক্রি শুরু করেন। বাবার পুরোনো ঝিনুকের ব্যবসার স্মৃতি থেকে তিনি তাঁর কোম্পানির নাম দেন ‘শেল’, যা আজ বিশ্বজুড়ে এক পরিচিত নাম।

রয়্যাল ডাচ ও শেলের ঐতিহাসিক জোট

যখন স্যামুয়েল ‘শেল’ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক একই সময়ে সুমাত্রার জঙ্গলে আরেকটি বড় তেলশক্তি গড়ে উঠছিল, যার নাম ‘রয়্যাল ডাচ’। এর নেতৃত্বে ছিলেন অঁরি ডিটার্ডিং। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাকুর তেলক্ষেত্রে আগুন এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে মার্কাস স্যামুয়েলের শেল বিপদে পড়ে। টিকে থাকার তাগিদে ১৯০৭ সালে রয়্যাল ডাচ এবং শেল একীভূত হয়ে ‘রয়্যাল ডাচ শেল’ গঠন করে। নতুন এই কোম্পানিতে রয়্যাল ডাচের শেয়ার ছিল ৬০ শতাংশ। এই জোট অচিরেই বিশ্বব্যাপী স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকে কড়া চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় এবং আধুনিক তেল ব্যবসার নতুন ভিত্তি স্থাপন করে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: তেলের প্রথম লড়াই

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তেলের কৌশলগত গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ঘোড়া ও কয়লার যুগ শেষ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্ত হয় মোটরসাইকেল, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান আর তেলচালিত জাহাজ। ১৯১৪ সালে প্যারিস রক্ষায় ট্যাক্সিতে করে সৈন্য পাঠানোর ঘটনা প্রমাণ করে, তেলচালিত পরিবহন যুদ্ধে কতটা দ্রুত ও কার্যকর। মিত্রশক্তির নৌবাহিনী কয়লার বদলে তেল ব্যবহার করায় তারা বেশি সুবিধা পেয়েছিল। মিত্রশক্তির হাতে বিশ্ব তেল উৎপাদনের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা সহজেই দীর্ঘ যুদ্ধের চাপ সামলাতে সক্ষম হয়। তেলশক্তির এই আধিপত্যের কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে অনেকেই ‘তেলের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ বলে থাকেন।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দখল ও ‘রেড লাইন’ চুক্তি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এটা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ভবিষ্যতের ক্ষমতা তার হাতেই থাকবে, যার হাতে তেল আছে। এই সময় সবার নজর পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী কালুস্তে গুলবেনকিয়ান ব্রিটিশ, জার্মান ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকে এক করে টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি গঠন করেন। তিনি নিজের জন্য ৫ শতাংশ শেয়ার রেখে দেন, যার কারণে তিনি ‘মিস্টার ফাইভ পারসেন্ট’ নামে পরিচিত হন। ১৯২৮ সালে তাঁর উদ্যোগে বিখ্যাত ‘রেড লাইন’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্যের পুরোনো সীমানায় তেলের বাঁটোয়ারা নিশ্চিত হয়।

উদ্বৃত্ত তেলের যুগে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ

১৯২০-এর দশকের শেষে যুক্তরাষ্ট্রে এত বেশি তেল উঠতে থাকে যে, তেলের বাজার ধসে পড়ার উপক্রম হয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১৯২৮ সালে বড় কোম্পানিগুলো স্কটল্যান্ডে গোপনে ‘অ্যাজ-ইজ’ চুক্তিতে পৌঁছায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন তেল অনুসন্ধানকারীদের কারণে সেই নিয়ন্ত্রণ খুব একটা টেকেনি। অতিরিক্ত উৎপাদন ঠেকাতে এক পর্যায়ে মার্শাল ল জারি করতে হয় এবং উৎপাদন কোটা বেঁধে দেওয়া হয়। রাতে চুরি করে পাচার হওয়া তেলকে বলা হতো ‘হট অয়েল’, যা পরে আইন করে বন্ধ করা হয়। মূলত এখান থেকেই আজকের নিয়ন্ত্রিত তেল বাজারের বা ওপেকের (OPEC) মতো সংস্থার প্রাথমিক ধারণার জন্ম হয়।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জ্বালানি সংকট ও জার্মানির পতন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়-পরাজয় অনেকাংশেই তেলের ওপর নির্ভর করেছিল। হিটলারের জার্মানির নিজস্ব কোনো প্রাকৃতিক তেলক্ষেত্র ছিল না। তারা কয়লা থেকে ব্যয়বহুল কৃত্রিম তেল বানাত। তেলের অভাবেই হিটলারের রাশিয়া অভিযান স্টালিনগ্রাদে মুখ থুবড়ে পড়ে। উত্তর আফ্রিকাতেও জ্বালানির অভাবে জেনারেল রোমেলের বাহিনী এগোতে পারেনি। অন্যদিকে মিত্রশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল তেল সরবরাহের কারণে স্বাচ্ছন্দ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ব্রিটিশ স্পিটফায়ার বিমানে ১০০-অকটেন জ্বালানি ব্যবহারের কারণে তারা আকাশযুদ্ধে জার্মানিকে পর্যুদস্ত করে। যুদ্ধের শেষদিকে জ্বালানি কারখানায় বোমা হামলার ফলে জার্মানির যুদ্ধবিমানগুলো মাটিতেই পড়ে থাকে।

প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের মরিয়া যুদ্ধ

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের সামরিক অবস্থারও একই করুণ দশা হয়েছিল। ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে তারা পুরোপুরি মরিয়া হয়ে ওঠে। নতুন তেলের খোঁজে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ দখলের পথ পরিষ্কার করতেই জাপান পার্ল হারবারে মার্কিন নৌবহরে হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। যুদ্ধের শেষদিকে তেলের এতটাই অভাব ছিল যে, জাপান পাইনগাছের শিকড় থেকে তেল বানানোর চেষ্টা করে। জ্বালানি বাঁচাতে জাপানি পাইলটরা ফেরার পথ না রেখে সরাসরি আত্মঘাতী ‘কামিকাজে’ হামলা চালাত।

উপসংহার

দুই বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আধুনিক বিশ্বে তেলের চেয়ে বড় কোনো কৌশলগত হাতিয়ার নেই। তেল শুধু মানুষের জীবনযাত্রা বা অর্থনীতিকে উন্নত করেনি, এটি বড় বড় সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছে, নতুন পরাশক্তির জন্ম দিয়েছে এবং বিশ্বের ভৌগোলিক মানচিত্র নতুন করে এঁকেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজোকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে জ্বালানি না থাকা কিংবা হিটলারের আত্মহত্যার পর পেট্রল ঢেলে লাশ পোড়ানো—ইতিহাসের এই নির্মম ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে, আধুনিক সভ্যতায় মানুষের ভাগ্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই কালো তরলের কাছেই কীভাবে বন্দি হয়ে আছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ