মাটির নিচ থেকে তোলা কালো তরল তেল। এটি শুধু জ্বালানি নয়, এটি পৃথিবীর ইতিহাস বদলানোর এক বড় শক্তি। প্রথম পর্বে আমরা জেনেছিলাম তেলের আবিষ্কারের গল্প। আজ দ্বিতীয় পর্বে জানব, কীভাবে রুশ সাম্রাজ্যের তেলশিল্পের উত্থান হলো এবং কীভাবে দুই বিশ্বযুদ্ধে তেল সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠল।
উনিশ শতকের শেষ দিকে তেলের দুনিয়ায় বড় পরিবর্তন আসে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের তেলক্ষেত্রগুলোই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু ধীরে ধীরে কাস্পিয়ান সাগরের তীরের বাকু অঞ্চল নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাকুর তেলের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৮৪৬ সালে সেখানে প্রথম কূপ থেকে তেল তোলার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং ১৮৫৯ সালে প্রথম শোধনাগার গড়ে ওঠে। তবে এই শিল্পে আসল পরিবর্তন আসে ১৮৭২ সালে, যখন রুশ সাম্রাজ্য তেলসমৃদ্ধ জমি ব্যক্তিগত খাতে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে বড় পুঁজিপতিদের জন্য বাকুর দরজা খুলে যায়। ঠিক সেই সময়ে সুইডিশ নোবেল ভ্রাতৃদ্বয়, রবার্ট ও লুডভিগ নোবেল, বাকুর তেলশিল্পে পা রাখেন। তারা ‘ব্রানোবেল’ নামে একটি কোম্পানি খোলেন, যা দ্রুত রুশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী তেল কোম্পানিতে পরিণত হয়। তারা তেল তোলা, শোধন ও পরিবহনে আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসেন। পাইপলাইন ও ট্যাংকার ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বাকুর তেলকে পুরো ইউরোপের বাজারে পৌঁছে দেন।
বাকুর তেলশিল্পে নোবেলদের পাশাপাশি আরেকটি বড় শক্তি হিসেবে আসে ফরাসি রথসচাইল্ড ব্যাংকিং পরিবার। রথসচাইল্ডরা উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী আর্থিক পরিবার ছিল। তারা বাকুর তেল ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। তবে বাজার আরও বড় করতে লন্ডনের ব্যবসায়ী মার্কাস স্যামুয়েলের সাহায্যে তারা এশিয়ার বাজারেও প্রবেশ করে। মার্কাস স্যামুয়েল বড় সমুদ্রগামী ট্যাংকার তৈরি করেন, যার মাধ্যমে সরাসরি জাহাজে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা সম্ভব হয়। তিনি ১৮৯২ সালে তার ট্যাংকার সুয়েজ খাল দিয়ে নেওয়ার অনুমতি পান। এরপর তিনি ‘শেল’ নামে কোম্পানি খোলেন। অন্যদিকে, ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) ‘রয়্যাল ডাচ’ নামে আরেকটি কোম্পানি গড়ে ওঠে, যার নেতৃত্বে ছিলেন অঁরি ডিটার্ডিং। ১৯০৭ সালে শেল ও রয়্যাল ডাচ একীভূত হয়ে ‘রয়্যাল ডাচ শেল’ গঠন করে, যা পরে স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকে বড় চ্যালেঞ্জ জানায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তেলের গুরুত্ব কতটা, তা বিশ্ববাসী ভালোভাবে বুঝতে পারে। ট্যাংক, বিমান, ট্রাক, মোটরসাইকেল—সবকিছুই তেলে চলতে শুরু করে। যুদ্ধের মাঠে দ্রুত সৈন্য ও রসদ পাঠাতে তেলের কোনো বিকল্প ছিল না। নৌযুদ্ধেও কয়লার বদলে তেলের ব্যবহার শুরু হয়, কারণ তেলচালিত জাহাজ দ্রুত চলে এবং সহজে পরিচালনা করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের পেছনে বড় কারণ ছিল তাদের হাতে বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৭০% এর বেশি থাকা। রয়্যাল ডাচ শেল এবং স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি ব্রিটিশ ও মার্কিন বাহিনীকে প্রচুর তেল সরবরাহ করে, যা মিত্রশক্তিকে যুদ্ধে এগিয়ে রাখে। এ কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে অনেকে ‘দা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড অয়েল ওয়ার’ বা ‘তেলের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ বলে থাকেন।
বিশ্বযুদ্ধ শেষে তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্য তখন তেলের নতুন বড় ক্ষেত্র হিসেবে উঠে আসে। ১৯০৮ সালে ইরানে বড় তেলক্ষেত্র আবিষ্কার হয় এবং ব্রিটিশ সরকার সেখানে নিয়ন্ত্রণ নেয়। অন্যদিকে, কালুস্তে গুলবেনকিয়ান নামে এক আর্মেনীয় ব্যবসায়ী অটোমান সাম্রাজ্যে তেলের সম্ভাবনা দেখে ১৯১২ সালে ‘টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি’ গঠন করেন। তিনি নিজের জন্য ৫% শেয়ার রেখে বাকিটা ব্রিটিশ ও জার্মানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। ১৯২৮ সালে তিনি ‘রেড লাইন’ চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশের তেলের ভাগাভাগি নিশ্চিত করেন। তবে তেলের জোগান এত বেশি হয়ে যায় যে বাজারে দাম পড়ে যেতে থাকে। তখন বড় কোম্পানিগুলো ১৯২৮ সালে ‘অ্যাজ-ইজ অ্যাগ্রিমেন্ট’ করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন উৎপাদকরা অতিরিক্ত তেল তুলে বাজারে আনলে এই চুক্তি ব্যর্থ হয়। অবশেষে মার্কিন সরকার উৎপাদন কোটা ও আইন দিয়ে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ শুরু করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও তেল ছিল অন্যতম বড় হাতিয়ার। জার্মানির হিটলার নিজের দেশে তেল না থাকায় কয়লা থেকে কৃত্রিম তেল বানানোর চেষ্টা করেন, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তেলের অভাবেই জার্মানি ‘ব্লিটজক্রিগ’ বা বিদ্যুৎগতির যুদ্ধ কৌশল নেয়। কিন্তু তেলের ঘাটতির কারণে তাদের অনেক বড় অভিযান ব্যর্থ হয়, যেমন রাশিয়ার ককেশাস ও উত্তর আফ্রিকার অভিযান। অন্যদিকে, মিত্রশক্তি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশাল তেল সরবরাহ দিয়ে যুদ্ধে এগিয়ে যায়। মিত্রশক্তি হিটলারের তেল কারখানাগুলোতে বোমাবর্ষণ করে জার্মানির জ্বালানি উৎপাদন ধ্বংস করে দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও জাপানের সামরিক পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবরোধ। শেষ পর্যন্ত তেলই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে।
















