যুদ্ধবিরতির ঠিক আগেই রাশিয়ার ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ইউক্রেনে নিহত ২৬, আহত অন্তত ৮০

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মঙ্গলবার বিকেলটা ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জন্য আর দশটা স্বাভাবিক দিনের মতোই ছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই শান্ত পরিবেশ এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। আকাশ থেকে হঠাৎ ধেয়ে আসা রাশিয়ার ড্রোন ও শক্তিশালী গ্লাইড বোমার আঘাতে ইউক্রেনের কয়েকটি অঞ্চলে অন্তত ২৬ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধারকারীরা একের পর এক লাশ বের করে আনছেন। এই বর্বরোচিত হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন আরও ৮০ জনের বেশি মানুষ। আহতদের আর্তনাদে হাসপাতালগুলোর পরিবেশ এখন ভারী হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকরা দিনরাত পরিশ্রম করেও অনেক মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এই হামলার পেছনের ঘটনা শুনলে যে কেউ শিউরে উঠবেন। কারণ, ঠিক এমন এক সময়ে রাশিয়া এই হামলা চালাল, যখন রাজধানী কিয়েভের ঘোষণা করা একটি বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি শুরুর আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি ছিল। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের পর সাধারণ মানুষ যখন একটু শান্তিতে ঘুমানোর স্বপ্ন দেখছিলেন, ঠিক তখনই এই নির্লজ্জ আঘাত আসে। অন্যদিকে, আগামী তিন দিনের মধ্যে মস্কোও একটি যুদ্ধবিরতি শুরুর বড় পরিকল্পনা করছিল। গত সোমবার কিয়েভ ও মস্কো দুই পক্ষই এই পাল্টাপাল্টি যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো সত্যিই রক্তপাত থামবে। কিন্তু রাশিয়ার এই হঠাৎ হামলা প্রমাণ করল যে, শান্তির আশা এখনো অনেক দূরের পথ।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

মঙ্গলবার বিকেলের এই তাণ্ডবে রাশিয়ার বোমারু বিমানগুলো ইউক্রেনের পূর্ব দিকের ক্রামাতোরস্ক, দক্ষিণ-পূর্বের জাপোরিঝিয়া এবং উত্তরের চেরনিহিভ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে। জাপোরিঝিয়ার গভর্নর ইভান ফেদোরভ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে সাংবাদিকদের জানান, শুধুমাত্র তাঁর এই অঞ্চলেই অন্তত ১২ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১২ জনের বেশি। এই মানুষগুলো হয়তো কেউ বাজার করছিলেন, কেউবা কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, দোনেৎস্ক অঞ্চলের কিয়েভ নিয়ন্ত্রিত শেষ বড় শহর ক্রামাতোরস্কে অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দিনিপ্রো শহরে মারা গেছেন আরও ৪ জন মানুষ। প্রতিটি মৃত্যুই একেকটি পরিবারের চিরস্থায়ী কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার পাশাপাশি রাশিয়া ইউক্রেনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ারও চেষ্টা করছে। সোমবার দিবাগত রাতে পোলতাভা ও খারকিভ অঞ্চলে ইউক্রেনের সরকারি গ্যাস স্থাপনাগুলোতে তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দফায় দফায় হামলা চালায়। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি নাফতোজাজের প্রধান নির্বাহী পরিচালক সেরহি কোরেতস্কি জানান, ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের এই ভয়াবহ হামলায় তাদের ৩ জন নিরীহ কর্মচারী এবং ২ জন সাহসী উদ্ধারকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন আরও ৩৭ জন। এই কর্মীরা রাতে শুধু নিজেদের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

জ্বালানি স্থাপনায় এই হামলার কারণে ইউক্রেনের অর্থনীতিতে এক বিশাল ধস নেমেছে। সেরহি কোরেতস্কি বলেন, হামলায় তাদের স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং গ্যাস উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এই হামলায় ইউক্রেনের প্রায় ১৫% স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা এক ধাক্কায় কমে গেছে। ধ্বংস হওয়া আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং স্থাপনা নতুন করে মেরামত করতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার ($২৫,০০০,০০০) খরচ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এই হামলার ফলে ওই এলাকার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ গ্রাহকের ঘরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কনকনে শীতের মধ্যে গ্যাস না থাকায় শিশু ও বয়স্ক মানুষরা চরম কষ্টে দিন পার করছেন।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরও এমন অমানবিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে রাশিয়া বিশ্ববাসীর সামনে তাদের আসল রূপ প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, এটি রাশিয়ার ‘চরম নৈরাশ্যজনক ও নির্লজ্জ আচরণ’। তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তারা রাশিয়ার এই অমানবিক কাজের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেন। যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের সীমানাতেই আটকে নেই। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ২% বেড়ে গেছে। এর ফলে সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষকেই পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধের মাশুল গুনতে হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ এখনো চলছে। ফায়ার সার্ভিস এবং সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা বেঁচে গেছেন, তারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম আতঙ্কে আছেন। যুদ্ধবিরতির মিথ্যা আশ্বাসের পর সাধারণ ইউক্রেনীয়রা এখন আর কোনো রাজনৈতিক ঘোষণায় বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। তাদের কাছে এখন প্রতিটি মুহূর্তই যেন মৃত্যুর অপেক্ষা। শান্তি কবে আসবে, তা কেউ জানে না। তবে এই নিরীহ মানুষগুলোর রক্ত আর আর্তনাদ পৃথিবীর ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়েই লেখা থাকবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ