ওয়াল স্ট্রিটে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই (AI) গত কয়েক বছর ধরে
বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, এখন আরও
একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি সেখানে ঢেউ তুলেছে। প্রযুক্তিটির নাম কোয়ান্টাম
কম্পিউটিং। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (BCG) গবেষকদের মতে, ২০৪০ সালের
মধ্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় $৮৫০ বিলিয়ন ডলার
পর্যন্ত নতুন আর্থিক মূল্য যোগ করতে পারে।
গত বছর কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম এআই
কোম্পানিগুলোর চেয়েও বেশ দ্রুতগতিতে বেড়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের
মাঝামাঝি সময়ে দেখা যায়, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ওপর নির্ভরশীল কিছু বিশেষ
কোম্পানি যেমন—আয়নকিউ (IonQ), রিগেটি কম্পিউটিং (Rigetti Computing) এবং
ডি-ওয়েভ কোয়ান্টামের (D-Wave Quantum) শেয়ারের দাম আগের ১২ মাসে প্রায়
৬,২০০% পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। এই বিশাল অঙ্কের মুনাফা সহজেই ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড়
বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের এই বিশাল জোয়ারে বিলিয়নিয়াররা
এসব ছোট এবং নতুন কোম্পানিতে সরাসরি বিনিয়োগ করতে খুব একটা আগ্রহী নন। এর পেছনে বেশ
কিছু বড় কারণ রয়েছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তিন দশকে ইন্টারনেটের পর যত নতুন ও যুগান্তকারী
প্রযুক্তি এসেছে, তার সবই শুরুতে একটি সাময়িক ‘বাবল’ বা বুদবুদ
তৈরি করেছে। এসব বাবল তৈরি হয় কারণ বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় অতিরিক্ত আশা
করে বসেন যে নতুন কোনো প্রযুক্তি খুব দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যাবে এবং
কোম্পানিগুলো রাতারাতি বিপুল লাভ করবে। কিন্তু বাস্তবে কোয়ান্টাম
কম্পিউটারগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী হতে এবং কোম্পানিগুলোর
জন্য বিশাল মুনাফা আনতে আরও অনেক সময় লাগবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোয়ান্টাম
কম্পিউটিং এখন তেমনই একটি বাবল বা বুদবুদের দিকে এগোচ্ছে, যা যেকোনো সময় ফেটে
যেতে পারে।
শুধু তাই নয়, আয়নকিউ, রিগেটি এবং ডি-ওয়েভ কোয়ান্টামের মতো কোম্পানিগুলোর বর্তমান
শেয়ারের দাম তাদের আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অর্থনীতির ভাষায় একে
প্রাইস-টু-সেলস (P/S) রেশিও বলা হয়। ইতিহাস বলে, নতুন কোনো
প্রযুক্তির শুরুতে থাকা কোম্পানির পি/এস রেশিও যদি ৩০-এর বেশি হয়,
তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে কখনোই টিকে থাকে না। গত সপ্তাহের শেষে এই তিনটি কোম্পানির
পি/এস রেশিও ছিল ৯৪ থেকে শুরু করে ৭৩৫-এর মধ্যে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের এই বাজারে নতুন কোম্পানির প্রবেশ করা তুলনামূলকভাবে বেশ
সহজ, ফলে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। সম্ভবত এই কারণেই বিলিয়নিয়ার বা বড়
বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি না নিয়ে গুগলের (Google) মূল কোম্পানি
অ্যালফাবেটের (Alphabet) ওপরই তাদের আস্থা রেখেছেন। অ্যালফাবেটকে
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে ধরা
হচ্ছে।
ছোট ও নতুন কোম্পানিগুলোর বিপরীতে অ্যালফাবেটের রয়েছে একটি শক্ত ও প্রতিষ্ঠিত
ব্যবসা। ইন্টারনেট সার্চের দুনিয়ায় গুগলের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে।
বিশ্বের মোট ইন্টারনেট সার্চ ট্রাফিকের প্রায় ৯০% যায় গুগলের দখলে।
পাশাপাশি গুগলের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহৃত ওয়েবসাইট হলো
ইউটিউব। এই বিশাল গ্রাহক ভিত্তির কারণে অ্যালফাবেট ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারে
নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে, যা তাদের একটি
শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেয়। তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের
বাজারে শেষ পর্যন্ত তারাই রাজত্ব করবে বলে বিলিয়নিয়াররা বিশ্বাস করেন।
















