বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিএনপির অতীতের প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান পদক্ষেপ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ও আইনি সংস্কারের আলোচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বরাবরই একটি প্রধান বিষয়। দীর্ঘ দুই দশক বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য বারবার জোরালো দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর দলটির আগের কথার সাথে বর্তমান কাজের এক বিরাট অমিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিরোধী দলে থাকার সময় বিএনপি সবসময় অভিযোগ করত যে, বিচার বিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তাদের নেতাকর্মীদের চরম হয়রানি করা হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিতর্কিত মামলায় সাজা দেওয়া, জেলে পাঠানো এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা—এই সবকিছুকেই তারা বিচার বিভাগের পরাধীনতার বড় প্রমাণ হিসেবে দেখত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার কারণে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিএনপি তখন বারবার বলত, দেশের আদালত স্বাধীন হলে তাদের এমন অবিচারের মুখে পড়তে হতো না।

২০২৩ সালের ১৩ জুলাই বিএনপি রাষ্ট্র কাঠামোর রূপান্তরের জন্য একটি ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। ওই রূপরেখার ১০ নম্বর দফায় তারা স্পষ্টভাবে কথা দিয়েছিল যে, সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায় মেনে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। তারা আরও বলেছিল, নিম্ন আদালতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে দেওয়া হবে এবং বিচার বিভাগের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি সচিবালয় গঠন করা হবে।

এরপর গত বছর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি এসব প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানায়। জুলাইয়ের জাতীয় সনদেও এসব বিষয় যুক্ত ছিল এবং বিএনপি সাধারণ মানুষকে তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এমনকি গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ইশতেহারেও বিএনপি প্রতিশ্রুতি দেয় যে, নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনা হবে এবং ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে।

কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টো। এবারের নির্বাচনে সংসদে ৬৭% বা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ৯ এপ্রিল এই শক্তিশালী সংসদই বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে। দলটির এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত সবাইকে অবাক করেছে।

বিএনপির ৩১ দফায় বিখ্যাত মাসদার হোসেন মামলার উল্লেখ ছিল। এই রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক দলিল। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতেই ছিল। কিন্তু পরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা রাষ্ট্রপতির হাতে চলে যায় এবং পঞ্চম ও ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের সাথে ‘পরামর্শ’ করার নিয়ম যোগ করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই সংশোধনীগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে একটি জনস্বার্থ মামলাও হয়।

মূলত মাসদার হোসেন মামলার রায় আসার সময় নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ছিল নির্বাহী বিভাগ বা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিভিন্ন সময় নিজেদের রায়ে পরিষ্কার করেছে যে, শুধু আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ১৬তম সংশোধনী মামলার রায়ে আপিল বিভাগ স্পষ্ট জানিয়েছিল, নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা রক্ষার ভার যতক্ষণ নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকবে, ততক্ষণ দেশের বিচার বিভাগ কোনোভাবেই স্বাধীন হতে পারবে না।

বিচার বিভাগ-Judiciary

সম্পর্কিত নিবন্ধ