ভূমধ্যসাগরে জীবনের ঝুঁকি: গ্রিস উপকূলে বাংলাদেশিসহ ৩০০ জনের বেশি অভিবাসী উদ্ধার
উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে আবারও সাগরে চরম বিপদে পড়েছেন শত শত মানুষ। গ্রিসের কোস্টগার্ড গত দুই দিনে ক্রিট দ্বীপের কাছের ভূমধ্যসাগর থেকে ৩০০ জনের বেশি অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করেছে। ছোট নৌকায় গাদাগাদি করে জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে তারা ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। গ্রিসের সরকারি কর্মকর্তারা মঙ্গলবার জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও মিশর, ইয়েমেন এবং সুদানের নাগরিকরা এই দলে আছেন।
গ্রিসের কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার তারা সাগরে ভাসমান অন্তত তিনটি ভাঙাচোরা ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা থেকে প্রায় ১৫০ জনকে উদ্ধার করে। এই সংখ্যা মোট উদ্ধার হওয়া মানুষদের প্রায় ৫০%। মঙ্গলবার ওই এলাকায় প্রচণ্ড বাতাস ও বৈরী আবহাওয়া ছিল। কিন্তু এত বাধা সত্ত্বেও সাগরে কোস্টগার্ডের তল্লাশি অভিযান অব্যাহত থাকে। মূলত মানবপাচারকারীরা এসব সাধারণ মানুষকে উন্নত জীবনের মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে মাথাপিছু প্রায় ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ ডলার পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। এরপর তাদের এমন নড়বড়ে নৌকায় তুলে সরাসরি মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের বর্তমানে ক্রিট দ্বীপের পুলিশের কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে। কোস্টগার্ডের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পর খুব শিগগিরই এদের সবাইকে গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। লিবিয়ার তোবরুক উপকূল থেকে সাগরপথে গ্রিসে প্রবেশের জন্য এই ক্রিট দ্বীপটি এখন মানবপাচারকারীদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের রুট হয়ে উঠেছে। তবে ভূমধ্যসাগরের এই পথটি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ানক এবং বিপজ্জনক রুটগুলোর একটি।
এই সাগরপথ পাড়ি দিতে গিয়ে এর আগেও অসংখ্য বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, গত মার্চের শেষের দিকে লিবিয়া থেকে আসার সময় সাগরে টানা কয়েক দিন ভেসে থেকে খাবার ও পানির অভাবে ২২ জন মানুষ মারা যান। সেবার যারা বেঁচে ফিরেছিলেন, তারা পুলিশকে জানান যে মৃতদেহগুলো উপায় না পেয়ে সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ওই ভয়ংকর ঘটনাতেও যারা শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ২১ জন ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক।
গ্রিসে প্রতি বছর গরমের সময় প্রচুর বিদেশি পর্যটক ঘুরতে আসেন। গত বছর ঠিক এই পর্যটন মৌসুমে অভিবাসীদের মাত্রাতিরিক্ত চাপ সামলাতে না পেরে গ্রিস সরকার টানা তিন মাসের জন্য আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছিল। সরকারের এমন কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তখন তীব্র সমালোচনা করে। কিন্তু ইউরোপে ঢোকার এই ঢল থামাতে গ্রিস সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থান দেখায়।
অবৈধ অভিবাসন এবং মানবপাচার পুরোপুরি ঠেকাতে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গ্রিসের বর্তমান রক্ষণশীল সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই কঠোর নীতির প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। অবৈধভাবে আসা মানুষদের যার যার নিজের দেশে দ্রুত ফেরত পাঠানোর জন্য ইউরোপের বাইরে বিশেষ ‘রিটার্ন হাব’ বা ফেরতকেন্দ্র তৈরির যে নতুন পরিকল্পনা চলছে, গ্রিস সরকার তাতে একমত পোষণ করেছে। এর ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়া মানুষদের জন্য সামনে সেখানে টিকে থাকা আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।
















