ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫৪তম সমাবর্তনের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আগামী বছরের ২৬ জানুয়ারি জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে সভাপতিত্ব করবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে ‘গেস্ট অব অনার’ বা বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের এই মিলনমেলাকে ঘিরে ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সদ্য ডিগ্রিপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সমাবর্তনের এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। রোববার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। সাক্ষাৎকালে তিনি রাষ্ট্রপতিকে ৫৪তম সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্মতি জানান। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সমাবর্তনে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নিজের সম্মতি নিশ্চিত করেছেন।
বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল। প্রতিনিধিদলে অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম, সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সাক্ষাৎকালে উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। একই সাথে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরেন।
বৈঠকে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি শতভাগ (১০০%) স্বাভাবিক রাখার পদক্ষেপগুলো রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন উপাচার্য। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণার অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। উপাচার্য জানান, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ ডিগ্রি প্রদান ও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চতর গবেষণার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে প্রশাসন। এসব গবেষণা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ ডলার ($৫০,০০,০০০) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষকদের কাজের পরিধি এবং গবেষণার মান আগের চেয়ে অন্তত ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য ঐতিহাসিক ভূমিকা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দেশের একটি শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, বরং এটি আমাদের রাজনীতি, ইতিহাস, মহান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান প্রাণকেন্দ্র। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জাতীয় সংকটে এই প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি সমাবর্তনের সার্বিক সাফল্য কামনা করার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে মুক্তবুদ্ধির চর্চা অব্যাহত রাখার তাগিদ দেন।
উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক মান অর্জনে জোর দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিক্ষা ও গবেষণার বরাদ্দ আরও বাড়ানো জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের কাতারে দেখতে চাইলে শিক্ষক ও গবেষকদের নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং সমাজ পরিবর্তনের উদ্ভাবনী শক্তিতে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার পরামর্শ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ৫৪তম সমাবর্তনে অংশ নিতে প্রায় ২২,০০০ গ্র্যাজুয়েট ইতিমধ্যে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এবারের আয়োজনে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রায় ১৫০ জন গবেষককে পিএইচডি ও এমফিল ডিগ্রি দেবে বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া অসাধারণ একাডেমিক ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে প্রায় ৮০ জন কৃতি শিক্ষার্থীর গলায় মহামান্য আচার্য স্বর্ণপদক পরিয়ে দেবেন। বিশাল এই উৎসবমুখর অনুষ্ঠান সফল করতে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠকে মূল ভেন্যু হিসেবে বেছে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকমিটি পুরোদমে কাজ শুরু করেছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে সমাবর্তন হলো সবচেয়ে গৌরবময় ও আনন্দঘন এক অধ্যায়। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে জীবনের নতুন ধাপে পা রাখার আগে রাষ্ট্রীয় অভিভাবক ও শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে পাওয়া সনদ ও অনুপ্রেরণামূলক দিকনির্দেশনা নবীনদের উজ্জীবিত করবে। আগামী ২৬ জানুয়ারির এই মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি পুরোদমে এগিয়ে নিচ্ছে।















