কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট লালন শাহের আখড়াবাড়িতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দিকে ডিম নিক্ষেপ করেছে একদল দুর্বৃত্ত। রোববার সন্ধ্যায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা এ সময় পাটওয়ারীকে বহন করা গাড়িটিতে ইটপাটকেল ছুড়ে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। এতে গাড়িটির প্রায় ১০০% কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। এই অতর্কিত হামলায় এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিগত সফরে কুষ্টিয়ার ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখতে এসেছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। বিকেলে তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ঘুরে দেখেন। এরপর সন্ধ্যার দিকে তিনি ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে পৌঁছান। সেখানে আখড়াবাড়ির শিল্পীদের কণ্ঠে লালনগীতি শুনে বের হওয়ার মুখে দুজন নারী তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে সরাসরি ডিম ছুড়ে মারে। সঙ্গে সঙ্গে পুরো চত্বরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার সময় সঙ্গে থাকা এনসিপির ভেড়ামারা উপজেলা সদস্যসচিব শোভন আহমেদ জানান, ডিম ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে গালিগালাজ করতে করতে এগিয়ে আসে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘তুই এখানে কেন আসছিস?’ হামলাকারীরা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সরাসরি মারতে উদ্যত হলে নেতাকর্মীরা তাঁকে ঘিরে ফেলেন। তখন হামলাকারীরা বেধড়ক লাঠিপেটা করে এনসিপির বেশ কয়েকজন কর্মীকে জখম করে। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে। এরপর হামলাকারীরা বাইরে থাকা প্রাডো গাড়িতে একের পর এক ইট ছুড়ে কাচ ভেঙে ফেলে। এতে প্রায় ৫০,০০০ টাকা বা প্রায় $৪৫০ সমমূল্যের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি।
ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এনসিপি কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্যসচিব সুলতান মারুফ তালহা অভিযোগ করেন, স্থানীয় ছাত্রদলের কর্মীরাই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। তবে জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বী এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, নাসীরুদ্দীনের ওপর হামলার ঘটনাটি অবশ্যই নিন্দনীয়। তবে ছাত্রদল কোনো ধরনের মব কালচার বা হিংসাত্মক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তাই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী বিন্দুমাত্র জড়িত নয়।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আমিনুল ইসলাম জানান, হামলার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এনসিপির শীর্ষ নেতাকে নিরাপদে সরিয়ে এনেছে। এদিকে হামলার বিচার চেয়ে কুমারখালী থানায় মামলা করতে রাত ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিনের কক্ষে যান এনসিপির প্রতিনিধিরা। তবে তাঁদের আগেই রাত ৯টার দিকে কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব আবু কাউছারের নেতৃত্বে ৫০ জনের বেশি নেতাকর্মী ওসির কক্ষে প্রবেশ করেন।
থানায় দুই পক্ষের মুখোমুখি উপস্থিতিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপি নেতারা ভেতরে বসার কিছুক্ষণ পর বিএনপির নেতাকর্মীরা বেরিয়ে গিয়ে থানা চত্বরে অবস্থান নেন। তাঁরা বাইরে জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। ভেতরে ওসি ও এনসিপি নেতাদের মধ্যে আলোচনা হলেও বাইরে অবস্থান নেওয়া ৫০-৬০ জন নেতাকর্মীর চাপের মুখে মামলা নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে রাত ১২টার দিকে কোনো মামলা না করেই থানা ছাড়তে বাধ্য হন এনসিপি নেতারা। পুলিশ তাঁদের নিরাপত্তার স্বার্থে খোদ ওসির গাড়িতে তুলে এলাকা পার করে দেয়।
এদিকে লালন আখড়াবাড়ির মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে এমন ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনায় কুষ্টিয়াজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে তীব্র ক্ষোভ জানানো হচ্ছে। ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে এক যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে জেলা জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সহনশীল পরিবেশ বজায় না থাকলে এ ধরনের সংঘাত আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে।















