নোয়াখালীর কবিরহাট সরকারি ডিগ্রি কলেজের পূর্ব গেটসংলগ্ন অত্যন্ত মূল্যবান সরকারি খাসজমি বালু ফেলে দখলের চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত তারেক রহমান রাজন কবিরহাট উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক আরাফাতুর রহমান হাসানের ছোট ভাই। গত রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে কলেজ সড়কের পাশের প্রায় দুই শতক সরকারি জায়গায় ট্রাকভর্তি বালু ফেলে ভরাটের কাজ শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং কাজে সরাসরি বাধা দেন। ঘটনার পরপরই এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কবিরহাট উপজেলা প্রশাসন দ্রুততম সময়ের মধ্যে জায়গাটির সীমানা নির্ধারণে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কবিরহাট বাজারের কলেজ গেট সড়কের পাশে নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন এই দুই শতক জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে লাল নিশানা ও সরকারি খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত ছিল। কিন্তু কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়াই হঠাৎ করে ছুটির দিনে বালু ফেলতে শুরু করেন অভিযুক্তরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, সড়কের একেবারে সম্মুখভাগে অবস্থিত হওয়ায় এই জায়গাটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বাজারে প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $৯,০০০ থেকে $১০,০০০ ডলারের সমান। এমন মহামূল্যবান সরকারি সম্পত্তি দখল হয়ে যাচ্ছে দেখে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান।
স্থানীয়দের বাধার মুখে অভিযুক্তরা বালু ভরাটের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতেও রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাজারের বিভিন্ন সরকারি খাসজমি ও ফুটপাত দখলের চেষ্টা হয়েছে। তাই এবার জেলা প্রশাসনের এই চিহ্নিত সরকারি জায়গাটি যাতে কোনোভাবেই বেহাত না হয়, সে জন্য তাঁরা প্রশাসনের কাছে শতভাগ (১০০%) স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষ চান, প্রশাসন অবিলম্বে জমির সঠিক মালিকানা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
এদিকে সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন তারেক রহমান রাজন। নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেন, ওই সরকারি দাগের ঠিক পেছনের অংশে তাঁর নিজস্ব কেনা প্রায় দুই শতক বৈধ জমি রয়েছে। নিজের নিচু জমিটি ভরাট করার সুবিধার্থেই তিনি সাময়িকভাবে সামনের ফাঁকা জায়গায় বালুর স্তূপ রেখেছিলেন। তাঁর দাবি, সরকারি জায়গা স্থায়ীভাবে দখল করার ০% বা কোনো ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। নিজের পেছনের জমির কাজ শেষ হওয়ামাত্রই তিনি সামনের সব বালু সম্পূর্ণ সরিয়ে নিতেন।
ছোট ভাইয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কবিরহাট উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক আরাফাতুর রহমান হাসান বলেন, তাঁর পরিবারের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাইয়ের নামে ওই এলাকায় রেজিস্ট্রি করা ‘চান্দিনা ভিটা’র জমি রয়েছে। তবে সেই কেনা সম্পত্তিটি ঠিক রাস্তার সামনের অংশে নাকি পেছনের অংশে পড়েছে, সে বিষয়ে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন। সরকারিভাবে সীমানা পরিমাপ করার পর প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত দেবে, তাঁরা তা নিঃশর্তভাবে মেনে নেবেন।
অভিযোগ পাওয়ার পরপরই কবিরহাট উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূদম পুষ্প চাকমা জানান, স্থানীয়দের অভিযোগ পেয়েই তিনি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) ও সার্ভেয়ারকে সরকারি ম্যাপ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, সরকারি কোনো জমিতে বালু ফেলা বা অবকাঠামো নির্মাণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কেউ কোনো ধরনের অনুমতি নেয়নি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও সরকারি দুই ধরনের জায়গার অস্তিত্বই পাওয়া গেছে।
ইউএনও পূদম পুষ্প চাকমা আরও জানান, সোমবার সকালে সরকারি সার্ভেয়ারের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে জমি মেপে কোনটি সরকারি খাসজমি এবং কোনটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা, তা লাল নিশানা দিয়ে আলাদা করা হবে। এ বিষয়ে উপস্থিত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষকে নোটিশ পাঠিয়েছে প্রশাসন। সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধ দখলের বিন্দুমাত্র সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের এই কঠোর বার্তার পর সরকারি জমি রক্ষা পাওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত হয়েছেন কবিরহাটের সাধারণ মানুষ।















