আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। শিক্ষকতা কোনো সাধারণ পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার এক আজীবন ব্রত। শ্রেণিকক্ষে একদল কোমলমতি শিশুর নিষ্পাপ চাহনি আর তাদের নির্মল ভালোবাসাই একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শত অভাব-অনটন আর জীবনযুদ্ধের ক্লান্তির মাঝেও যখন একজন শিক্ষক ক্লাসে পা রাখেন, তখন শিক্ষার্থীদের হাসিমুখ দেখে নিমেষেই সব কষ্ট উবে যায়। এই শিশুদের অনাবিল ভালোবাসার টানেই লাখো শিক্ষক আজও সমাজের সব অবহেলা সহ্য করে পরম যত্নে মানুষ গড়ার কারিগরি অব্যাহত রেখেছেন।
রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এই ভালোবাসার কথাই বলেন। কুড়িগ্রামের এক প্রত্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, ‘মাস শেষে পাওয়া সামান্য বেতনে সংসার চালানো কঠিন হলেও প্রতিদিন সকালে যখন কচি মুখগুলো একরাশ আনন্দ নিয়ে “স্যার কেমন আছেন” বলে ছুটে আসে, তখন মনে হয় এই পেশায় এসে কোনো ভুল করিনি। ওদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ওদের মুখের দিকে তাকিয়েই প্রতিদিন ক্লাসে যাই। সত্যি বলতে কি, এই ছোট্ট শিশুদের জন্যই আজ আমি একজন শিক্ষক।’ শিক্ষার্থীদের এই গভীর ভালোবাসাই শিক্ষকদের প্রতিদিন নতুন করে পথ চলার শক্তি জোগায়।
তবে এই অকৃত্রিম ভালোবাসার পাশাপাশি দেশের শিক্ষকদের জীবনবাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক পাঠদান করছেন। এর মধ্যে শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই কর্মরত আছেন প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার শিক্ষক। কিন্তু আর্থসামাজিক মর্যাদার দিক থেকে তাঁরা আজও চরম অবহেলিত। একজন সহকারী শিক্ষকের শুরুর মূল বেতন মাত্র ১২,৫০০ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় едва $১০০ থেকে $১১০ সমমূল্যের। বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের সঙ্গে এই স্বল্প আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
শিক্ষার মান বাড়াতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনেস্কোর সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৪% থেকে ৬% অথবা জাতীয় বাজেটের ১৫% থেকে ২০% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে বহু বছর ধরে শিক্ষা খাতের মোট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১.৭% থেকে ২% এর ঘরে আটকে আছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, জাতীয় বাজেটের অন্তত ৬০% অর্থ শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, উচ্চতর গবেষণা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণে খরচ করা উচিত। উপযুক্ত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকায় মেধাবী তরুণরা দিন দিন এই মহান পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের তথ্যে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭৫% শিক্ষক অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপে পাঠদানে শতভাগ (১০০%) মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। নানা ধরনের উপাত্ত সংগ্রহ, উপবৃত্তি বিতরণ ও নির্বাচনের কাজের ভার প্রাথমিক শিক্ষকদের একপ্রকার ক্লান্ত করে তোলে। এছাড়া আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানের সুযোগও এখনো বেশ সীমিত। বিশেষ করে দেশের প্রায় ৫০% গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত কম্পিউটার ল্যাব বা আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব সীমাবদ্ধতার মাঝেও শিক্ষকেরা নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে শিশুদের পড়িয়ে যাচ্ছেন।
সীমাহীন প্রতিকূলতার মাঝেও শিক্ষার্থীদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই শিক্ষকদের একমাত্র সান্ত্বনা। শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষক যে মমতার বীজ বুনে দেন, তা কোনো পার্থিব ধন-সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন শিক্ষার্থী যখন বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়, দেশের নেতৃত্ব দেয় এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তখনই শিক্ষকের সারা জীবনের কষ্ট সার্থক হয়। আজকের এই আনন্দঘন দিনে দেশের সব শিক্ষক তাঁদের স্নেহের শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছেন। একই সাথে বিশ্বের সকল প্রান্তের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁরা অশেষ শুভকামনা জানাচ্ছেন।
কেবল বছরে এক দিন মিষ্টি কথা আর ফুলের তোড়ায় শিক্ষকদের সম্মান সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই ক্ষণে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করা এবং শিক্ষকদের জন্য একটি যুগোপযোগী স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালু করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষকেরা মর্যাদা নিয়ে বাঁচলে গোটা দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য রইল উষ্ণ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।















