শখের ৬৫০ টাকার চাকু কেড়ে নিল রিকশাচালকের প্রাণ: জন্মদিনের রাতে গাবতলীতে খুন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ফুটপাত থেকে শখ করে মাত্র ৬৫০ টাকায় একটি চাকু কিনেছিল ১৬ বছরের এক কিশোর। পছন্দের জিনিসটি কিনতে পেরে সে বন্ধুদের ডেকে ডেকে দেখিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু কে ভেবেছিল, সেই শখের চাকুই এক রাতে কেড়ে নেবে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন! নিজের জন্মদিনের রাতে মদ পান করে বন্ধুদের উসকানিতে সেই চাকু দিয়ে ২৬ বছর বয়সী এক রিকশাচালককে কুপিয়ে হত্যা করেছে ওই কিশোর। গত বুধবার ভোররাতে রাজধানীর দারুসসালামের গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় ঘটেছে এই ভয়ংকর ঘটনা। পুলিশ জানিয়েছে, কোনো অপরাধের অতীত না থাকা সত্ত্বেও ক্ষণিকের উত্তেজনায় একটি সাধারণ রাতের আড্ডা মুহূর্তেই একটি হত্যাকাণ্ড ও মামলায় রূপ নিয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে জানা গেছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাদের (ছদ্মনাম) বয়স ১৬ বছর পূর্ণ হয়। জন্মদিন উদ্‌যাপন করতে গিয়ে এক পরিচিত তরুণের পার্টিতে সে জীবনে প্রথমবারের মতো মদ পান করে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রাত ১টার দিকে সে গাবতলী এলাকায় এসে ফোন দিয়ে বাসা থেকে ডেকে আনে আরেক কিশোর বন্ধু ফরিদকে (ছদ্মনাম)। দুই বন্ধু গভীর রাতে রাস্তায় ঘোরাঘুরির সময় তাদের পাশ দিয়ে এক রিকশাচালক যাচ্ছিলেন। তাঁকে ছিনতাইকারী ভেবে প্রথমে সন্দেহ করলেও পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু এরপরও ওই চালকের সঙ্গে দুই কিশোরের তীব্র কথা-কাটাকাটি হয়।

এরপর পরিস্থিতি শান্ত হলেও রাত ৩টার দিকে সাদ ও ফরিদ তাদের আরেক বন্ধু জাহিদকে (ছদ্মনাম) ঘুম থেকে ডেকে আনে। তারা গাবতলীর আল্লাহর দান হোটেলের পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় রিকশাচালকের বিষয়টি তোলে। তদন্তে জানা যায়, জাহিদ ওই চালককে মারধর করার জন্য বন্ধুদের বারবার উসকানি দিতে থাকে। ঠিক তখনই কাকতালীয়ভাবে সেই রিকশাচালক আবার তাঁদের চোখের সামনে পড়েন। কিশোররা তাঁকে ঘিরে ধরলে তিনি ভয়ে পাশের একটি হোটেলে ঢুকে পড়েন। এতে কিশোররা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর চালক হোটেল থেকে বের হতেই জাহিদ তাঁকে সজোরে থাপ্পড় মারে। সঙ্গে সঙ্গে সাদ পকেট থেকে ৬৫০ টাকা (প্রায় $৫ থেকে $৬ সমমূল্যের) দামের ধারালো চাকুটি বের করে চালকের ঘাড়ের পেছনে গভীর আঘাত করে।

চাকুর মারাত্মক আঘাত পাওয়ার পর রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশা চালিয়ে কোনোমতে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন চালক। কিন্তু মাত্র কয়েক গজ দূরে যাওয়ার পরই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েই তিন কিশোর দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। দারুসসালাম থানায় মামলা হওয়ার পর ডিবির মিরপুর বিভাগ হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের চেহারা শনাক্ত করে। এরপর ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে ফরিদকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যে ভোলা থেকে জাহিদকে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে মূল অভিযুক্ত সাদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, নিহত রিকশাচালকের নাম ইমন সর্দার (২৬)। তাঁর বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার রাধানগর গ্রামে। বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কারণে পারিবারিক অশান্তি থাকায় তিনি গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় একাই থাকতেন। রাজধানীতে কখনো রিকশা চালিয়ে, কখনো দিনমজুরি করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঘটনার তিন দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় পুলিশ তাঁর পরিবারকে খবর দেয়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পরিবারের কাছে তাঁর মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে হতদরিদ্র পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোকের মাতম।

ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, গ্রেপ্তার তিন কিশোরের কারও বয়সই বেশি নয়; সাদের বয়স ১৬ বছর আর বাকি দুজনের বয়স ১৫ বছরের কম। তাদের কারও বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল না। কেবল বয়সের উত্তেজনা, নেশা ও বন্ধুদের উসকানিতেই এই খুন হয়েছে। পুলিশ জানায়, শুধু ঢাকাতেই এখন পর্যন্ত ১২৭টি কিশোর গ্যাং শনাক্ত হয়েছে। তবে এই ঘটনায় কোনো সংঘবদ্ধ গ্যাং জড়িত না থাকায় বিষয়টি সমাজের জন্য আরও বড় বিপদের সংকেত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদের ১০০% সচেতনতা ছাড়া কিশোরদের বিপথগামী হওয়া ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ