নেপালে হিমবাহধসে লাশের মিছিল: নিহতের সংখ্যা ৫৭৯ ছাড়াল, ২ হাজার মানুষ নিখোঁজ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নেপালে হিমবাহধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় শোক আর আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মানুষ এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। চারদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। উদ্ধারকারীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কাউকে জীবিত বের করে আনতে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৯ জনে। এর বাইরে চীনের তিব্বত অংশে আরও ৫ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে উদ্ধারকাজে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য মোতায়েন থাকলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। বরং নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (আইএফআরসি) তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে নেপালে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ। হিমবাহধসের পর গত বুধবার থেকে চলা এই দুর্যোগে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এখন ১ হাজার ৯২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৪০ জনই বিদেশি নাগরিক। এদের বড় একটি অংশ ভারতের তীর্থযাত্রী, যারা তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের দিকে যাচ্ছিলেন। তিব্বতের গিরং এলাকাতেও নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন, যাদের মধ্যে ২৬০ জনই পর্যটক। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ১০ জন মার্কিন নাগরিকের একটি দলও নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।

এদিকে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের কাছে দুটি নতুন কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ভূমিধসে নদীর মুখ আটকে যাওয়ায় সেখানে প্রায় ২৫ লক্ষ ঘনমিটার পানি জমা হয়েছে। যেকোনো সময় এই হ্রদ ভেঙে নিচের জনপদগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, গতকাল নেপালের ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরের বাসিন্দাদের ১০০% সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা নদীর পানির স্তর মাপার জন্য সেন্সর বসানোর কাজ শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আগেভাগে শক্তিশালী সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকত, তবে অন্তত ৪০% থেকে ৫০% ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত।

উদ্ধারকাজে গতি আনতে নেপাল সরকার এখন বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তার সুযোগ দিচ্ছে। বর্তমানে ৪ হাজার ৪০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য এবং সেনাবাহিনীর বিশাল একটি দল মাঠে কাজ করছে। রাসুয়া ও নুয়াকোটের মতো দুর্গম এলাকাগুলোতে যাতায়াতের রাস্তা ও সেতু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই হেলিকপ্টার ছাড়া ওই সব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৭৩ জনকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, দুর্গম এলাকা থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭২% ভারতীয় নাগরিক।

বন্যায় উদ্ধার হওয়া মানুষের আহাজারি কলিজা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রাসুয়া থেকে উদ্ধার হওয়া দিবগা তামাং বলেন, ‘আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। পরিবারের সবাই ভেসে গেছে। এখন কার জন্য বেঁচে থাকব জানি না।’ এমন অসংখ্য মানুষ এখন আশ্রয়শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। নিখোঁজদের জীবিত পাওয়ার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসলেও উদ্ধারকারীরা মাটি খুঁড়ে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মেটাতে নেপাল সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন। প্রাথমিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এবারের বন্যায় অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে তা ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও বেশি হতে পারে। দেশটির সরকার জরুরি তহবিলের জন্য ২ হাজার কোটি নেপালি রুপি বরাদ্দ করেছে। তবে পুনর্গঠন কাজের জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য। বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে আড়াই হাজার কোটি নেপালি রুপি বা তার বেশি অর্থের জোগান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারত ও চীনও খাদ্য ও জরুরি ওষুধ পাঠিয়ে সহায়তা করছে।

ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে সরকার ‘এক দরজা নীতি’ বা ওয়ান-ডোর পলিসি চালু করেছে। এর ফলে সাহায্যকারী সংস্থাগুলোকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মাধ্যমে অর্থ বা সামগ্রী দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে তুষার গলে যাওয়ার হার আগের চেয়ে অন্তত ২০% বেড়েছে, যা এই ধরণের আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ। ভবিষ্যতে এমন বিপদ এড়াতে চীন ও নেপালকে যৌথভাবে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ