প্রতিরক্ষায় আরও শক্তিশালী ভারত: আমেরিকার ‘ট্যাংক ঘাতক’ জ্যাভেলিন কিনছে নয়াদিল্লি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার সামরিক বন্ধুত্ব এবার এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। শত্রু শিবিরের শক্তিশালী ট্যাংক ধ্বংস করতে ভারত এখন মার্কিন প্রযুক্তির বিশ্বখ্যাত ‘জ্যাভেলিন’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি এতটাই আধুনিক যে একজন সেনাসদস্য এটি অনায়াসেই নিজের কাঁধে বহন করতে পারেন এবং নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেন। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর সম্প্রতি এই খবরটি নিশ্চিত করেছেন, যা দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে অর্থাৎ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভারতের কাছে এই অত্যাধুনিক ‘এফজিএম–১৪৭ জ্যাভেলিন’ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছিল।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল ‘এক্স’-এ এই চুক্তিকে একটি ‘বিরাট সুখবর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে এবং ভারত এটি কেনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি বড় প্রতিফলন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত হওয়া ‘শাংরি-লা সংলাপ’-এ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যে শক্তিশালী অংশীদারত্বের কথা বলেছিলেন, এই চুক্তি তারই বাস্তব রূপ। এই পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশ মিলে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন করার পথেও অনেকটা এগিয়ে যাবে। বর্তমানে ভারত ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রায় ১০০% ইতিবাচক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো এর ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ বা ‘ছোড়ো এবং ভুলে যাও’ প্রযুক্তি। এটি তৈরি করেছে আমেরিকার নামকরা দুই প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও আরটিএক্স। সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি অনেক বেশি কার্যকর কারণ এটি ছোড়ার পর সেনাসদস্যকে আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। ক্ষেপণাস্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তুকে তাড়া করে ধ্বংস করে দেয়। ফলে নিক্ষেপকারী ব্যক্তি দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারেন, যা যুদ্ধে প্রাণহানি কমাতে সাহায্য করে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি ট্যাংকের সামনের বর্মে আঘাত না করে বরং এর ওপরের অংশে বা ‘ক্যানোপিতে’ আছড়ে পড়ে। ট্যাংকের এই অংশটি সবচেয়ে কম সুরক্ষিত থাকে, ফলে আঘাত লাগার পর ট্যাংকের ধ্বংস হওয়া প্রায় নিশ্চিত।

ভারত ঠিক কতটি জ্যাভেলিন ব্যবস্থা কিনছে এবং এর জন্য মোট কত টাকা বা ডলার খরচ হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আগের কিছু নথি থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এই চুক্তির আওতায় প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার ($93,000,000) মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম কেনা হতে পারে। এই বড় অংকের চুক্তিতে ১০০টির মতো জ্যাভেলিন ইউনিট থাকার কথা রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বর্তমানে সামরিক খাতে ব্যয়ের দিক থেকে ভারত বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম দেশ। অন্যদিকে, ইউক্রেনের পর ভারতই বিশ্বের ২য় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক রাষ্ট্র। এই বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারত তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আগের চেয়ে অন্তত ২০% থেকে ৩০% বৃদ্ধি করতে চায়।

মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে আমেরিকার সেনাবাহিনী ও মেরিন কোরসহ বিশ্বের হাতেগোনা কিছু উন্নত দেশ ব্যবহার করে। সার্জিও গর মনে করেন, এই চুক্তির ফলে ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও উপকৃত হবে। দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করলে প্রযুক্তি বিনিময়ের পথ সুগম হবে। এতে করে ভারতের স্থানীয় কোম্পানিগুলোও আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরির কৌশল শিখতে পারবে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে দেশীয় উপাদানের ব্যবহার ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না এলেও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা একে ভারতের সামরিক আধুনিকায়নের একটি বিশাল ধাপ হিসেবে দেখছেন।

আবদ্ধ জায়গা যেমন বহুতল ভবন বা মাটির নিচের বাঙ্কার থেকেও নিরাপদে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়, যা পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় ভারতের জন্য তুরুপের তাস হতে পারে। রাশিয়ার তৈরি অস্ত্রের ওপর ভারতের নির্ভরতা একসময় অনেক বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি আমেরিকার দিকে বেশি ঝুঁকছে। আধুনিক সমরাস্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখাই এখন নয়াদিল্লির প্রধান লক্ষ্য। জ্যাভেলিন কেনার এই চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক কৌশলেরও একটি অংশ। ভারত ও আমেরিকার এই যৌথ পথচলা আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতিতে আরও বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ