ঝিনাইদহের শৈলকুপায় তরুণ সমাজকে মাদক, সামাজিক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক বিভেদ থেকে দূরে রাখতে এক বর্ণাঢ্য ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। ‘আগামীর শৈলকুপা’ নামের একটি সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের পৃষ্ঠপোষকতায় এই আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে শৈলকুপা সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত বা ফাইনাল খেলাটি সম্পন্ন হয়। এই আয়োজনকে ঘিরে পুরো উপজেলায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কয়েক হাজার ফুটবল প্রেমী মানুষের উপস্থিতিতে খেলার মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, যা শৈলকুপার ক্রীড়া ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ফাইনাল ম্যাচে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরো খেলা উপভোগ করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাঠে বসে খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য দেখেন এবং করতালির মাধ্যমে তাদের উৎসাহ দেন। খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় তিনি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার ওপর বিশেষ জোর দেন। আয়োজক কমিটির দেওয়া তথ্য মতে, পুরো টুর্নামেন্টটি আয়োজনে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকারও বেশি অর্থাৎ প্রায় ৩০০০ ডলার খরচ করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল যুবসমাজকে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়া। টুর্নামেন্টে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ফুটবল দলগুলো অংশ নেয় এবং প্রতিটি ম্যাচেই দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গড়ে প্রায় ৯৫% দর্শক সমাগম প্রতিটি ম্যাচে মাঠের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আয়োজক সংগঠন ‘আগামীর শৈলকুপা’-এর সদস্যরা জানান, তাদের মূল লক্ষ্য কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা নয়, বরং সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মাদকাসক্তি দূর করা। শৈলকুপায় বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তরুণদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা কমিয়ে আনতেই এই ফুটবল খেলার আয়োজন। তারা মনে করেন, মাঠের লড়াইয়ে যখন বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়রা একে অপরের সাথে মিলিত হয়, তখন পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ে। সংগঠনের একজন সমন্বয়ক বলেন, আমরা চাই শৈলকুপার ১০০% যুবক যেন খেলার মাঠের সাথে যুক্ত থাকে, যাতে তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে পা না বাড়ায়।
খেলার মাঠে আসা সাধারণ দর্শকরা জানান, দীর্ঘদিন পর শৈলকুপায় এমন পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তারা দেখতে পেলেন। রাজনৈতিক দলমত নির্বিশেষে মানুষ একই গ্যালারিতে বসে প্রিয় দলের জন্য চিৎকার করছে—এমন দৃশ্য শৈলকুপায় বিরল। স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, খেলাধুলা থাকলে পাড়ায় পাড়ায় মারামারি বা সহিংসতা অন্তত ৩০% থেকে ৪০% কমে আসবে। তরুণরা যদি মাঠে ব্যস্ত থাকে, তবে তারা আড্ডাবাজি বা খারাপ পথে যাবে না। এই টুর্নামেন্টের ফলে এলাকার ছোট ছোট ব্যবসায়ীদেরও ব্যাপক লাভ হয়েছে। মাঠের আশপাশে বসা দোকানিরা জানান, ফাইনাল খেলার দিন তাদের বেচাকেনা স্বাভাবিক দিনের চেয়ে প্রায় ৭০% বেশি হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আজকের তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, রাজনীতিতে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সমাজ উন্নয়নে আমাদের সবাইকে এক হতে হবে। মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে তিনি বলেন, সরকার ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রেখেছে এবং গ্রাম পর্যায়ে এমন টুর্নামেন্ট আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন। তিনি জয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, হার-জিৎ বড় কথা নয়, এই যে সম্প্রীতি তৈরি হলো এটিই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আয়োজকরা আগামীতেও এই ধরনের টুর্নামেন্ট চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারা জানান, শীত মৌসুমে একটি বড় আকারের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়াও উপজেলার ফুটবল প্রতিভাদের তুলে আনতে তারা একটি ফুটবল একাডেমি গড়ার কথাও ভাবছেন। খেলা শেষে চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে বিশালাকার ট্রফি এবং আকর্ষণীয় অর্থ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। মাঠ থেকে ফেরার পথে হাজারো মানুষের মুখে ছিল খেলাধুলার জয়গান এবং শৈলকুপার এই পরিবর্তনের আশাবাদ। সুন্দর ও অহিংস শৈলকুপা গড়ার এই যাত্রা যেন থেমে না থাকে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বিকেলে গোধূলি লগ্নে আলো-আঁধারির মাঝে যখন আতশবাজি ফুটিয়ে বিজয় উদযাপন করা হচ্ছিল, তখন পুরো শৈলকুপা শহর যেন এক নতুন প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পায়। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো অনুষ্ঠানটি সফল করতে ১০০% নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল, যার ফলে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এই মেগা ইভেন্টটি সম্পন্ন হয়।
















