ক্রিকেট মাঠে একটি জয় খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মনে অনেক সুন্দর স্মৃতি তৈরি করে। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া ৮৬ রানের এই জয়টি বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের কাছে একেবারে অন্য রকম এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। কার্ডিফের সেই ঐতিহাসিক জয়ের ঠিক ২১ বছর পর অজিদের বিপক্ষে আবার এমন দুর্দান্ত এক জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। বৃষ্টিবিঘ্নিত এই ম্যাচে ডিএলএস পদ্ধতিতে জয় এলেও মাঠে বাংলাদেশের দাপট ছিল ১০০% স্পষ্ট। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের দর্শকরা আজ মন ভরে উপভোগ করেছেন এই জয়। শোনা যাচ্ছে, এই ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে ১০,০০০$ বোনাস ঘোষণা করতে পারে।
এই অভাবনীয় জয়ের সবচেয়ে বড় নায়ক তরুণ ফাস্ট বোলার নাহিদ রানা। তার নিখুঁত লাইন-লেংথ, সহজাত গতি আর ভয়ংকর বাউন্সার আজ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। তারা বল ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই তা সোজা উইকেটরক্ষকের গ্লাভসে জমা হচ্ছিল। এমন দৃশ্য বাংলাদেশের ক্রিকেটে খুব একটা দেখা যায় না। শুধু গতি দিয়ে নয়, চোখে চোখ রেখে লড়াই করার দারুণ সাহসও দেখিয়েছেন নাহিদ। জশ ইংলিসকে আউট করার পর তিনি রীতিমতো তেড়ে যান এবং আগ্রাসী ভাষায় কিছু একটা বলেন। নাহিদ তাকে ঠিক কী বলেছিলেন তা পরিষ্কার না হলেও, তার কথা অজিদের অহংকারে প্রবলভাবে আঘাত করেছে। ইংলিসের হতাশ মুখাবয়ব দেখেই সেই ক্ষোভ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল।
মিরপুরের মাঠে ২৮৫ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নামা অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ধাক্কা দেন তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের একদম প্রথম বলেই তিনি ম্যাথু শর্টকে বোকা বানিয়ে সাজঘরে পাঠান। অফ স্টাম্পের বাইরে পড়া বল মারাত্মক গতিতে ভেতরে ঢুকে শর্টের স্টাম্প ভেঙে দেয়। অবিশ্বাসে মাথা নাড়তে নাড়তে ড্রেসিংরুমের পথ ধরা ছাড়া তার সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। ঠিক পরের ওভারেই মোস্তাফিজুর রহমান মার্নাস লাবুশেনকে এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলেন। তখন অস্ট্রেলিয়ার রান মাত্র ২, আর তারা হারিয়ে বসেছে ২ উইকেট। শুরুতেই এমন ধাক্কা খেয়ে অজিরা পুরোপুরি ব্যাকফুটে চলে যায়।
এরপর অস্ট্রেলিয়া যখনই ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেছে, নাহিদ রানা তার গতির ঝড় তুলে তাদের নির্মমভাবে থামিয়ে দিয়েছেন। ১০ ওভার বল করে মাত্র ৪১ রান দিয়ে তিনি ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন। এর প্রতিটি বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি। ইংলিস ২৫ বলে ১৯ রান করে নাহিদের গতির কাছে হার মেনে লিটনের হাতে ক্যাচ দেন। পরে অ্যালেক্স ক্যারি ও কুপার কনোলি মিলে ৫৩ বলে ৪০ রান যোগ করে কিছুটা ভয়ংকর হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু ৬২ বলে ৪৭ রান করা ক্যারিকেও অসাধারণ এক ডেলিভারিতে ফিরিয়ে দেন নাহিদ। ক্যামেরন গ্রিন ৬৬ বলে ৫২ রান করে কিছুটা চেষ্টা করলেও তা শুধু অস্ট্রেলিয়ার হারের ব্যবধানই কমিয়েছে।
বোলিংয়ের আগে ব্যাটিংয়েও বাংলাদেশের শুরুটা বেশ নাটকীয় ছিল। টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই সাইফ হাসান আউট হয়ে যান। তবে তরুণ তানজিদ হাসান ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ৯১ বলে ৯৬ রানের চমৎকার এক জুটি গড়ে দলকে শক্ত ভিত দেন। তানজিদ ৪৪ বলে ৫৪ রান করে আউট হওয়ার পরপরই বাংলাদেশ হঠাৎ বিপদে পড়ে। মাত্র ৩৪ রানের ভেতর ৩ উইকেট হারিয়ে বসে তারা। শান্ত নিজেও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে ৮৬ বলে ৬৭ রান করে বিদায় নেন।
ঠিক সেই কঠিন সময়ে দলের হাল ধরেন মোসাদ্দেক হোসেন। প্রায় শেষ হতে বসা ক্যারিয়ারে নতুন প্রাণ পেয়ে তিনি আজ দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন। প্রথম ম্যাচেই এমন আলো ঝলমলে ইনিংস খেলে তিনি জাতীয় দলে নিজের জায়গা পাকা করার বড় আভাস দিয়ে রাখলেন। তার সঙ্গী তাওহিদ হৃদয় আজ একদমই স্বস্তিতে ছিলেন না। ৫১ বল খেলে হৃদয় মাত্র ১টি বাউন্ডারি মারতে পেরেছিলেন। হৃদয় ও মিরাজ দ্রুত ফিরে গেলে টেলএন্ডারদের নিয়ে মোসাদ্দেককে পুরো ৫০ ওভার খেলার বড় দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়।
মোসাদ্দেক এই কঠিন কাজটা অত্যন্ত দারুণভাবে সামলেছেন। ফিফটি পাওয়ার পরের ওভারেই তিনি স্পিনার অ্যাডাম জাম্পাকে টানা তিন বলে তিনটি বাউন্ডারি মারেন। তবে তার এই অপরাজিত ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ডারদেরও কিছুটা ‘অবদান’ আছে। তারা মাঠে আজ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে শুধু মোসাদ্দেকেরই ৪টি সহজ ক্যাচ মাটিতে ফেলে দেন। এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে মোসাদ্দেক ৭০ বলে ৭টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে অসাধারণ এক ইনিংস উপহার দেন।
তার এই দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সুবাদেই বাংলাদেশ ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের এক চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহ পায়। হয়তো জয়ের আসল ভিত ওই রানেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যতই এটি অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সারির দল হোক না কেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর পাওয়া এই জয় দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।














