মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টা। ঝিনাইদহ শহরের প্রাণকেন্দ্র পায়রা চত্বর লোকে লোকারণ্য। হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড আর ব্যানার নিয়ে জড়ো হয়েছেন নানা শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ। ‘আমরা ঝিনাইদহবাসী’ ব্যানারের নিচে দাঁড়িয়ে তারা একসুরে একটাই জোরালো দাবি তুলছেন ঝিনাইদহ সদরেই একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে। জেলার কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের এই প্রাণের দাবি আদায়ে এবার রাজপথে নেমেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তারা স্পষ্ট করে বলছেন, বছরের পর বছর ধরে শোনা শুধু ফাঁকা আশ্বাস তারা আর মানবেন না, এবার তারা কাজের সরাসরি বাস্তবায়ন দেখতে চান।
ঝিনাইদহ জেলায় মোট ৬টি উপজেলা রয়েছে। সদর, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডুর সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। একটু জটিল কোনো অসুখ বা দুর্ঘটনা ঘটলেই জেলার সরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো রোগীদের সরাসরি ঢাকা, খুলনা, যশোর বা রাজশাহীতে স্থানান্তর করে দেয়। স্থানীয়দের হিসাব মতে, জেলার প্রায় ৮০% মুমূর্ষু রোগীকে এভাবে চিকিৎসার জন্য অন্য জেলায় পাঠাতে হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় রাস্তাতেই বিনা চিকিৎসায় রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এই কষ্ট ও হাহাকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দূরের শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানো গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝাও বটে। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, থাকা-খাওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধের খরচ মেটাতে গিয়ে একেকটি পরিবারের অনায়াসেই প্রায় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। জমানো টাকা না থাকলে গ্রামের সাধারণ কৃষকদের অনেক সময় চড়া সুদে, প্রায় ২০% লাভে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। অনেক পরিবার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে নিজেদের শেষ সম্বল চাষের জমিও বিক্রি করে দেন। ঝিনাইদহ সদরে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হলে সাধারণ মানুষকে আর এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে না।
আন্দোলনকারীরা মানববন্ধনে অত্যন্ত যৌক্তিক একটি বিষয় সবার সামনে তুলে ধরেন। তারা বলেন, ঝিনাইদহ সদর উপজেলাটি ভৌগোলিক দিক থেকে পুরো জেলার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। এখানে জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। সবচেয়ে বড় কথা হলো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে জেলার বাকি ৫টি উপজেলা থেকে খুব সহজে এবং অনেক কম সময়ে সদর শহরে যাতায়াত করা যায়। তাই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি যদি সদরে স্থাপন করা হয়, তবে সব উপজেলার রোগী ও তাদের স্বজনরা সমানভাবে ১০০% সুবিধা পাবেন। অন্য কোনো একপেশে বা প্রত্যন্ত এলাকায় এটি নির্মাণ করলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি ও খরচ দুই-ই বাড়বে।
পায়রা চত্বরের এই বিশাল মানববন্ধনে জেলার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সংগঠক উপস্থিত থেকে জোরালো বক্তব্য রাখেন। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আব্দুস সবুর, প্রকৌশলী আবুল বাশার, এম এ কবির, শাহিনুর রহমান লিটন, ফখরুদ্দিন মুন্না, সাব্বির হোসেন জুয়েল এবং শারমিন সুলতানা অন্যতম। বক্তারা উপস্থিত জনতার সামনে বলেন, একটি মেডিকেল কলেজ শুধু ইট-পাথরের কোনো বহুতল ভবন নয়; এটি লাখো মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রধান ভরসাস্থল। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব স্বার্থে নয়, বরং পুরো জেলার মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে সদর উপজেলাকেই এই বড় মেগা প্রকল্পের জন্য বেছে নিতে হবে।
মানববন্ধন থেকে বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান-এর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বক্তারা। তারা স্মরণ করেন, ঝিনাইদহের সার্বিক উন্নয়নে তার অনেক বড় অবদান রয়েছে এবং তিনি সবসময় এলাকার মানুষের কথা ভাবেন। জেলার সাধারণ মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তিনি যদি আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেন এবং বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরেন, তবে সদরে এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন খুব দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে। তারা মন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানান, তিনি যেন ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেন এবং একটি দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির ব্যবস্থা করেন।
সবশেষে বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়ে তাদের কর্মসূচি শেষ করেন। তারা পরিষ্কারভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের এই শতভাগ যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে ঝিনাইদহ সদরে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলে আগামী দিনে আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ শুধু স্বাস্থ্যসেবাই নিশ্চিত করবে না, এটি এলাকায় হাজার হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। জেলার লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নত করতে এখন শুধু সরকারের একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।














