ঝিনাইদহে জোড়া খুনের বিচার চাওয়ায় বাদীকে বিদেশি অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে এক সাধারণ কৃষককে বিদেশি অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ওই কৃষক কোনো সাধারণ মানুষ নন, তিনি এলাকার একটি চাঞ্চল্যকর জোড়া হত্যা মামলার প্রধান বাদী। নিজের আপনজন হত্যার ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে এখন তিনি নিজেই মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে শ্রীঘরে বন্দী আছেন। মঙ্গলবার দুপুরে ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেছেন ভুক্তভোগী কৃষক রফিকুল ইসলাম রফির বৃদ্ধা মা লাইলী বেগম। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে সাংবাদিকদের জানান, তার ছেলেকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে আইন আদালত এমনিতেই ভয়ের জায়গা, তার ওপর এমন অস্ত্র মামলার খাঁড়া নেমে আসায় পুরো পরিবার ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একজন মা হিসেবে তিনি ছেলের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন।

ঘটনার পেছনের ইতিহাস বেশ রক্তক্ষয়ী এবং মর্মান্তিক। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি বাঘাডাঙ্গা গ্রামে এক ভয়ংকর জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। ওই দিন সীমান্তের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও কুখ্যাত অস্ত্রধারী তরিকুল ইসলাম আকালে এবং তার বাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে রফির আপন ভাই শামীম ও চাচা মন্টুকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। চোখের সামনে ভাই ও চাচাকে হারালেও রফি ভয় পাননি। তিনি সাহস করে ওই জোড়া হত্যা মামলার বাদী হন। এরপর থেকেই খুনি আকালে ও তার সহযোগী কবীর রফিকে মামলা তুলে নিতে নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। মামলা তুলে না নিলে রফিকেও ঠিক একইভাবে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছিল সন্ত্রাসীরা। এলাকার প্রায় ৯০% মানুষ জানেন যে এই খুনি চক্রটি কতটা ভয়ংকর।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সংবাদ সম্মেলনে লাইলী বেগম গত ৩ জুনের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। ওই দিন সকালে রফি নিজের জমিতে গবাদিপশুর জন্য নেপিয়ার ঘাস কাটতে গিয়েছিলেন। ঘাস কেটে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফেরার পথে বিজিবির একটি টহল দল তার পথ আটকায়। রফি কোনো অপরাধ করেননি, তাই তিনি সরল বিশ্বাসে মোটরসাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। বিজিবি সদস্যরা তার শরীর তল্লাশি করে অবৈধ কিছুই পায়নি। লাইলী বেগমের অভিযোগ, এরপর রফিকে জোর করে টেনে ঘাসখেতের ভেতর নিয়ে যায় বিজিবি সদস্যরা। কিছুক্ষণ পর তারা ঘাসখেতের এক কোণ থেকে ভারতীয় পলিথিনে মোড়ানো একটি বস্তু উদ্ধার করে এবং সেটিকে আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক অস্ত্র বলে দাবি করে।

এই উদ্ধার অভিযান নিয়ে মারাত্মক আইনি ও যৌক্তিক গরমিল রয়েছে বলে দাবি করে রফির পরিবার। কালোবাজারে এ ধরনের একটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তলের দাম প্রায় ১,৫০০থেকে২,০০০ডলার হয়ে থাকে। সাধারণ একজন কৃষকের পক্ষে এত দামি অস্ত্র কেনা বা পাচার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরিবারের সদস্যরা প্রশ্ন তোলেন, যে কৃষক নিজের গরুর জন্য ঘাস কাটতে যায়, সে কেন এত দামি বিদেশি অস্ত্র নিয়ে ঘুরবে? সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মামলার এজাহারে পুলিশকে বলা হয়েছে, অস্ত্রটি রফির শরীর তল্লাশি করে পাওয়া গেছে। অথচ গত ৩ জুন বিজিবির দেওয়া নিজস্ব প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল, অস্ত্রটি রফির নেপিয়ার ঘাসখেত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই দুই ভিন্ন বক্তব্যের কারণে বিজিবির ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ১০০% সন্দেহ তৈরি হয়েছে। পরিবারের দাবি, খুনি আকালে বাহিনী নিজেদের বাঁচাতে বিজিবিকে ভুল তথ্য দিয়ে প্রভাবিত করে এই অস্ত্র উদ্ধারের মিথ্যা নাটক সাজিয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

জোড়া খুনের মামলাটি ভিন্ন খাতে নিতে এর আগেও রফিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে সন্ত্রাসী আকালে বাহিনী। ভুক্তভোগীর মা জানান, গত ২০২৫ সালের ১১ মে ঘাস কেটে বাড়ি ফেরার পথে রফিকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানো হয়েছিল। কিন্তু সৌভাগ্যবশত সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং রফি প্রাণে বেঁচে যান। সন্ত্রাসী চক্রটি রফিকে মেরে ফেলতে না পেরে এবার প্রশাসনের কিছু অসাধু সোর্সের মাধ্যমে তাকে এই সাজানো অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে। একটি মিথ্যা মামলার কারণে পরিবারটিকে এখন উকিল ও আদালতের পেছনে অনেক টাকা খরচ করতে হচ্ছে। মামলা চালাতে গিয়ে পরিবারটির প্রতি মাসে ১০০থেকে২০০ডলারের সমপরিমাণ দেশীয় টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য বহন করা অসম্ভব। রফির পরিবার এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের ভয়, জেলের ভেতর বা বাইরে রফির জীবনের ওপর যেকোনো সময় বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে রফির মা ছাড়াও তার বোন জেসমিন আরা, মেয়ে লাকি বেগম, আত্মীয় জন আব্দুল আলীম, সোহরাব হোসেন, ইছাহাক সরদার, মহসিন আলী ও চঞ্চল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই রফির নিঃশর্ত মুক্তি এবং প্রকৃত খুনিদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানান। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি একেবারেই সত্য এবং রফির কাছ থেকেই বিদেশি অস্ত্র পাওয়া গেছে। বিজিবি কাউকে ফাঁসায়নি। এখন পুরো বিষয়টি সঠিক তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। এলাকার মানুষ আশা করছে, প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনবে এবং রফি যদি নির্দোষ হন, তবে তিনি ১০০% ন্যায়বিচার পাবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ