গ্রীষ্মকাল মানেই রকমারি সুস্বাদু ফলের এক বিশাল সমারোহ। চারদিকে আম, জাম, কাঁঠাল আর লিচুর ম–ম গন্ধ। এই মধুমাসকে বরণ করে নিতে এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে দেশীয় ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গাইবান্ধায় এক চমৎকার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। মঙ্গলবার, ৯ জুন দুপুরে গাইবান্ধা জেলা শাখার উদ্যোগে বাছাই করা পাঠচক্র সদস্যদের নিয়ে ‘মৌসুমী ফল উৎসব ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণ ছাত্ররাজনীতির বাইরে গিয়ে তরুণদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে তাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ও অভিভাবক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
ছাত্রশিবিরের জেলা মানবসম্পদ উন্নয়ন (এইচআরডি) বিভাগ অত্যন্ত উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে এই ফল উৎসবের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রশিবিরের গাইবান্ধা জেলা সভাপতি ইউসুফ আল কারযাভী। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীল ও চমৎকারভাবে সঞ্চালনা করেন জেলা মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক হুমায়ুন ফারহান সাদিক। আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তরুণদের উদ্দেশে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক ও চমৎকার বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও বগুড়া শহর শাখার সভাপতি হাবিবুল্লাহ খন্দকার। এছাড়া জেলা পর্যায়ের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও এই আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
প্রধান অতিথি হাবিবুল্লাহ খন্দকার তাঁর বক্তব্যে দেশীয় ফলের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত দিকের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। তিনি বলেন, আজকের এই ফল উৎসব শুধু একটি সাধারণ অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ঐতিহ্য এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার এক অনন্য উদযাপন। তিনি উপস্থিত তরুণদের মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ ছয় ঋতু ও বৈচিত্র্যের দেশ। গ্রীষ্মে আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম; বর্ষায় আনারস, পেয়ারা এবং শীতে কমলা বা বরইয়ের মতো ফল আমাদের খাদ্যতালিকাকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করে। আমাদের দেশের কৃষকরা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি করে এসব ফল উৎপাদন করেন। প্রতি বছর দেশ থেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে আম ও কাঁঠাল রপ্তানি করে সরকার কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। এই বিপুল পরিমাণ আয় আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করছে।
বর্তমান সময়ে তরুণরা দেশীয় সতেজ ফলের চেয়ে বিদেশি ও প্যাকেটজাত খাবারের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকছে। এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধান অতিথি বলেন, দেশীয় মৌসুমি ফল শুধু স্বাদেই অতুলনীয় নয়, বরং পুষ্টিগুণেও ১০০% অনন্য। এসব ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে দরকারি ভিটামিন, খনিজ উপাদান, আঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত বলছেন, ফরমালিনমুক্ত তাজা দেশীয় ফল খেলে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বাজার থেকে চকচকে বিদেশি আপেল বা মাল্টা কিনতে আমাদের অনেক টাকা বা ডলার ($) খরচ করতে হয়। অথচ এর চেয়ে অনেক কম খরচে আমরা দেশীয় তাজা ফল কিনে দ্বিগুণ পুষ্টি পেতে পারি।
আধুনিক ফাস্টফুড সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করে সভার অন্যান্য বক্তারা জানান, আজকাল তরুণরা ফাস্টফুডের দোকানে গিয়ে অনায়াসেই ১০বা২০
(ডলার) সমমূল্যের হাজার হাজার টাকা খরচ করে বার্গার, পিৎজা বা ক্ষতিকর প্রক্রিয়াজাত খাবার খাচ্ছে। এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার শরীরে মেদ বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগব্যাধি বাসা বাঁধতে সাহায্য করে। তাই বিদেশি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে দৈনন্দিন জীবনে দেশীয় মৌসুমি ফল খাওয়ার সুন্দর অভ্যাস গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি। এতে একদিকে যেমন নিজের শরীর সুস্থ ও সতেজ থাকবে, অন্যদিকে দেশের প্রান্তিক কৃষকরাও আর্থিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হবেন। আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রায় ৬০% সরাসরি এই কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য কিনে তাদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সব সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের নৈতিক মান উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে মাঠে কাজ করে। এইচআরডি বা মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল পাঠচক্রের সদস্যদের শুধু বইয়ের তাত্ত্বিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাদের বাস্তব জীবন, প্রকৃতি ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা। নিয়মিত পাঠচক্রের মাধ্যমে তরুণদের চরিত্র গঠন ও দেশপ্রেমিক সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। ফল উৎসবের মতো এমন সুন্দর আয়োজন সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য ও সম্প্রীতি আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
দুপুরের এই আয়োজনে শিক্ষার্থীরা সবাই একসাথে গোল হয়ে বসে নানা রকম দেশীয় ফলের স্বাদ গ্রহণ করেন। বিভিন্ন ধরনের ফলের পসরা সাজিয়ে পুরো হলরুমে এক চমৎকার উৎসবের আমেজ তৈরি করেন আয়োজকরা। উপস্থিত পাঠচক্র সদস্যরা এমন একটি শিক্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী আয়োজনে অংশ নিতে পেরে বেশ আনন্দ প্রকাশ করেন। আগামী দিনেও তরুণ সমাজকে মাদকের মতো বিপথগামিতা থেকে দূরে রাখতে এবং সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে উৎসাহিত করতে এমন গঠনমূলক আয়োজন নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ছাত্রশিবিরের নেতারা।














