খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা। পাহাড় আর সবুজে ঘেরা এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা সমতল এলাকার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও সংগ্রামের। দুর্গম এই পাহাড়ের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা পরিবারগুলোর কোমলমতি শিশুদের জন্য শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া সব সময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাহাড়ের সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শুধু এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করাই নয়, বরং মানবিক কাজের অংশ হিসেবে তারা এবার পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার মান উন্নয়নে সরাসরি এগিয়ে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় দীঘিনালার জারুলছড়ি এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ করেছে সেনাবাহিনী। মঙ্গলবার সকালে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে এই শিক্ষা উপকরণগুলো কোমলমতি শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
দীঘিনালা জোনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে জারুলছড়ি আর্মি ক্যাম্পের ঠিক পাশেই অবস্থিত জারুলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই চমৎকার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিদ্যালয়ের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন কিছু পাওয়ার আশায় বেশ আগ্রহ নিয়ে স্কুল মাঠে জড়ো হতে থাকে। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের মোট ৫০ জন শিক্ষার্থীর হাতে এই নতুন শিক্ষা সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এসব সামগ্রীর মধ্যে ছিল নতুন খাতা, কলম, পেন্সিল, সুন্দর পেন্সিল বক্স এবং বিস্কুট। অভাবের সংসারে এমন সুন্দর নতুন খাতা ও কলম হাতে পেয়ে পাহাড়ি এই শিশুদের চোখেমুখে যে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তা ছিল সত্যিই দেখার মতো। উপস্থিত অভিভাবকরাও সেনাবাহিনীর এমন মহতী উদ্যোগে বেশ খুশি হয়েছেন।
এই বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন দীঘিনালা জোনের জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন, এসইউপি, পিএসসি। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে একে একে শিশুদের হাতে উপহারগুলো তুলে দেন। উপহার দেওয়ার পাশাপাশি তিনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ হাসিমুখে গল্প করেন এবং তাদের নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক উৎসাহ জোগান। জোন অধিনায়ক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তোমরা যদি এখন থেকে পড়াশোনায় ১০০% মনোযোগ দাও, তবে তোমরাই একসময় এই দেশের বড় বড় জায়গায় কাজ করবে এবং এলাকার অভাব দূর করবে। তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদের একজন সৎ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পরমর্শ দেন।
পাহাড়ি এই দুর্গম অঞ্চলগুলোতে বসবাস করা বেশিরভাগ মানুষই আর্থিকভাবে বেশ অসচ্ছল। জুম চাষ বা দিনমজুরি করে তাদের অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয়। আমরা জানি, বর্তমান আধুনিক বিশ্বে উন্নত দেশগুলোতে একটি শিশুর শিক্ষার পেছনে পরিবারগুলো হাজার হাজার ডলার ()অনায়াসেইখরচকরে।কিন্তুআমাদেরদেশেরএইপাহাড়িগ্রামগুলোরচিত্রসম্পূর্ণভিন্ন।এখানকারঅনেকগরিবঅভিভাবকেরপক্ষেইসন্তানেরজন্যমাসেসামান্য৫)অনায়াসেইখরচকরে।কিন্তুআমাদেরদেশেরএইপাহাড়িগ্রামগুলোরচিত্রসম্পূর্ণভিন্ন।এখানকারঅনেকগরিবঅভিভাবকেরপক্ষেইসন্তানেরজন্যমাসেসামান্য৫
থেকে ১০$ (ডলার) বা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মতো বাড়তি খরচ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর্থিক এই চরম সংকটের কারণেই পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রায় ২০% থেকে ৩০% মেধাবী শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। এমন কঠিন বাস্তবতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যখন বিনামূল্যে খাতা-কলম নিয়ে শিশুদের পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু একটি উপহার থাকে না, বরং এটি একটি পরিবারের জন্য বিশাল বড় এক আর্থিক সাহায্য হিসেবে কাজ করে।
মঙ্গলবারের এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানে জোন অধিনায়কের পাশাপাশি এলাকার আরও অনেক গণ্যমান্য মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গগন বিকাশ চাকমা, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সেনাবাহিনীর এমন শিক্ষাবান্ধব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। তারা বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিয়ে আসছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তারা যেভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে, তা পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার স্কুলগুলোতে এমন সাহায্য আসায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসার আগ্রহ আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকরা দৃঢ়ভাবে মনে করেন, পাহাড়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতি ধরে রাখতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একটি শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার আলো পায়, তখন সে কোনো ধরনের ভুল পথে বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পা বাড়ায় না। শিক্ষা ও মানবিক সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এ ধরনের নিয়মিত উদ্যোগ পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এক দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সবাই গভীরভাবে আশা করছেন, এমন ছোট ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই পাহাড়ি এই জনপদ একদিন পুরোপুরি নিরক্ষরতামুক্ত হবে। এখানকার ছেলেমেয়েরা দেশের মূল অর্থনীতির চাকার সাথে ১০০% যুক্ত হয়ে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সাহায্য করবে।














