হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত, চুক্তির আগমুহূর্তে ইরানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email
Donald-Trump

মধ্যপ্রাচ্যে যখন একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তির আশা করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই পরিস্থিতি আবার নতুন করে চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’–এ একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা দিয়েছেন। তিনি তাঁর পোস্টে জানান, হরমুজ প্রণালিতে নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় ইরানের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার গুলি করে ভূপাতিত করেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ওই হেলিকপ্টারে থাকা দুজন পাইলটই শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার পেয়েছেন। এই ঘটনার পর ট্রাম্প চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এমন হামলার পর এখন প্রয়োজনীয় ও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

ট্রাম্পের এই কড়া বার্তার ঠিক আগেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে কিছুটা ভিন্ন খবর প্রচার করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ওমান উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার হঠাৎ করে বিধ্বস্ত হয়েছে এবং মার্কিন উদ্ধারকারী দল দ্রুত গিয়ে দুই পাইলটকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু ট্রাম্প সরাসরি ইরানকে দায়ী করায় পুরো ঘটনার মোড় এখন অন্যদিকে ঘুরে গেছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামিরও অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি খোলাখুলিভাবে জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ পেলেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইরানে আবারও জোরালো ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার এই ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি চুক্তির বিষয়ে দারুণ আশাবাদী ছিলেন। মঙ্গলবার দিনের বেলায় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চমৎকার একটি চুক্তির একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই চুক্তি সফল হলে ইরান কোনোভাবেই আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছিলেন, চুক্তি সই হওয়ার মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এমনকি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে একটি ‘চূড়ান্ত বিজয়’ ঘোষণারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু রাতের একটি ঘটনাই এখন সেই আশার আলো নিভিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছে।

এই সংঘাতের শুরুটা হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভেতরে সরাসরি সামরিক হামলা শুরু করে। নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে ইরান তখন থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই জলপথটি আক্ষরিক অর্থেই একটি লাইফলাইন। কারণ, সারা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই একটি মাত্র প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই পথ বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কয়েক ডলার ($) বেড়ে গেছে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সংঘাতের পাশাপাশি পর্দার আড়ালে কূটনীতির দরজাও অবশ্য খোলা রয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের শীর্ষ রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শান্তি চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো কথা না হলেও বন্ধুরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে দুই দেশ নিয়মিত বার্তা বিনিময় করছে। পাকিস্তান এখানে অত্যন্ত বিশ্বস্ত একজন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দুই দেশই চাইছে দ্রুত একটি সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছাতে।

অন্যদিকে, বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জন্য ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরাসরি ওয়াশিংটন প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, এই যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান পক্ষ হলো যুক্তরাষ্ট্র। তাই এখন যদি কোনো সামরিক উসকানির কারণে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হয় বা আলোচনা ভেস্তে যায়, তবে তার ১০০% দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই বর্তাবে। ইরান নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় সবসময় প্রস্তুত আছে বলেও তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন।

এখন পুরো বিশ্বের নজর আটকে আছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তিনি কি তাঁর দেওয়া হুমকি অনুযায়ী ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালাবেন, নাকি চুক্তির স্বার্থে এই ঘটনাকে কিছুটা ছাড় দেবেন? যদি সত্যিই নতুন করে হামলা শুরু হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হয়তো ১০০$ বা তার চেয়েও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর খাদের দিকে ঠেলে দেবে। সাধারণ মানুষ এখন শুধু এটাই চাইছে, দ্রুত একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি সই হোক এবং তেলের বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুক।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ