নেত্রকোনা জেলার হাওরবেষ্টিত দুর্গম উপজেলা খালিয়াজুরীতে এক অত্যন্ত উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে কৃতি শিক্ষার্থী এবং গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) বেলা ঠিক ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই সুন্দর ও প্রেরণাদায়ক আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করে স্থানীয় পরিচিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘হাওর কালচারাল একাডেমি’। মূলত হাওরাঞ্চলের যেসকল মেধাবী ছেলেমেয়ে শত প্রতিকূলতা পার করে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, তাদের উৎসাহ দিতেই এই আয়োজন করা হয়। একই সাথে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও এই মঞ্চে সম্মাননা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে সমাজের অনন্য ব্যক্তিত্ব ও গুণীজন হিসেবে মোট তিনজনকে বিশেষ সম্মাননা স্মারক বা ক্রেস্ট দেওয়া হয়। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নেত্রকোনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর। অনুষ্ঠানে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারায় তাঁর পক্ষে সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ করেন ব্যক্তিগত সহকারী মো. জহির আহমেদ জিকু। এছাড়া সাংবাদিকতায় দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী হেলিমকে এবং সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য চিকিৎসক ডা. সচিন্দ্র সরকারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আয়োজকেরা দৃঢ়ভাবে মনে করেন, সমাজে অন্তত ১০০% ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে এমন গুণী মানুষদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি।
এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে সংবর্ধনা পাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা হলেন—রৌদ্র চৌধুরী, ইয়াকিন, রাসেন সরকার, আশামনি, জাবেদ ইসলাম, সাব্বির আহমেদ এবং তৌহিদুর রহমান ফাগুন। হাওরের মতো একটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা থেকে উঠে এসে তারা সবাই নিজেদের মেধা ও শ্রমে দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ অর্জন করেছেন। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে শহরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অনেক সময় মাসে ১০০থেকে২০০(ডলার) বা তার সমপরিমাণ হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হয়। কিন্তু এই শিক্ষার্থীরা নিজেদের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে সেই কঠিন ভর্তিযুদ্ধ জয় করেছেন। অনুষ্ঠানে এই কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে ফুল ও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। হাওর কালচারাল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক পপি সরকার বর্ষা আনন্দের সাথে জানান, গত বছর ও চলতি বছর মিলিয়ে খালিয়াজুরী উপজেলার মোট ১৪ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে এ বছর ভর্তি হওয়া ৭ জন কৃতি শিক্ষার্থীকে আজ এই মঞ্চে সম্মান জানানো হলো।
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামানের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও চমৎকারভাবে পরিচালিত হয়। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, হাওরের ছেলেমেয়েরা জন্মগতভাবেই অনেক বেশি সংগ্রামী ও মেধাবী হয়, সঠিক সুযোগ পেলে তারা যেকোনো জয় ছিনিয়ে আনতে পারে। এতে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন কৃষ্ণপুর হাজী আলী আকবর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম পলাশ। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় আবদ্ধ না থেকে প্রকৃত মানুষ হওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ অতিথি হিসেবে নিজের মূল্যবান বক্তব্য দেন নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সভাপতি ম. কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম। তিনি সমাজ গঠনে সাংবাদিকদের ভূমিকা এবং তরুণদের দায়িত্ববোধ নিয়ে কথা বলেন। অনুষ্ঠানের একেবারে শুরুতে সবাইকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পপি সরকার বর্ষা। আর পুরো অনুষ্ঠানটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সাবলীল ও চমৎকারভাবে সঞ্চালনা করেন খালিয়াজুরী উপজেলা প্রেসক্লাবের সদস্য ও স্থানীয় সাংবাদিক আবুল কালাম।
সংবর্ধনা মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আরেফিন আজিম, খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন এবং খালিয়াজুরী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। ওসি নাসির উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে শতভাগ দূরে থাকার কড়া পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, একটি সুস্থ সমাজ গড়তে শিক্ষিত তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, মাধ্যমিক শিক্ষা একাডেমিক সুপারভাইজার এবং প্রধান শিক্ষক দীপংকর দত্ত রায় অনুষ্ঠানে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। খালিয়াজুরী উপজেলা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক মো. হাবিবুল্লাহ এবং সদস্য সচিব সোহান বিন নবাবও উপস্থিত থেকে ছাত্রছাত্রীদের আগামী দিনের জন্য প্রচুর উৎসাহ জোগান। তারা বলেন, আজকের এই তরুণেরাই আগামী দিনে দেশের হাল ধরবে এবং এলাকার নাম উজ্জ্বল করবে।
এই বিশাল অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত শিক্ষার্থী, তাদের গর্বিত অভিভাবক, বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো মিলনায়তন জুড়ে ছিল এক দারুণ উৎসবের আমেজ। সম্মাননা ক্রেস্ট হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি আনন্দিত হন এবং আয়োজক সংগঠন ‘হাওর কালচারাল একাডেমি’র প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, নিজেদের এলাকার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এই ধরনের স্বীকৃতি তাদের ভবিষ্যতের পথে আরও বড় সাফল্য আনতে অন্তত ৫০% বেশি অনুপ্রেরণা জোগাবে। উপস্থিত অভিভাবকরা দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেন, হাওর এলাকার মতো একটি প্রত্যন্ত জায়গা থেকে উঠে আসা এই তরুণরা একদিন পড়াশোনা শেষ করে দেশের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাবে। তারা নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে একদিন দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অনেক বড় ভূমিকা পালন করবে।














