দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সংস্কার, আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর লাখ লাখ ডলার ($) বা শত শত কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দেয় সরকার। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই থাকে এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু এই সরকারি বরাদ্দের টাকা কীভাবে কিছু অসাধু মানুষের পকেটে যায়, তার এক চরম উদাহরণ তৈরি হয়েছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সংস্কারকাজের নামে সেখানে রীতিমতো হরিলুট ও ভেলকিবাজির অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা না করে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছিল। তবে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সাধারণ মানুষের সচেতনতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাদের সেই চুরির চেষ্টা ভেস্তে গেছে।
হাসপাতালে এই দুর্নীতির অভিনব কৌশলটি ধরা পড়ে গত রবিবার, ৭ জুন রাতে। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বিদ্যুৎহীন অবস্থার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালের রান্নাঘরে তড়িঘড়ি করে দেওয়ালের টাইলস বসানোর কাজ চলছিল। সাধারণ প্রকৌশল বিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, পুরোনো কোনো দেওয়ালে টাইলস বসাতে হলে আগের প্লাস্টার পুরোপুরি ভেঙে বা অন্তত খোদাই করে নিতে হয়, যাতে সিমেন্ট ও টাইলস মজবুতভাবে আটকে থাকে। কিন্তু ঠিকাদারের লোকজন সেগুলোর কিছুই করেনি। তারা সময় ও টাকা বাঁচাতে সরাসরি পুরোনো আস্তরণের ওপরই সিমেন্ট লেপে টাইলস বসিয়ে দিচ্ছিল। খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে হাজির হন। তারা কাজের এমন ভয়াবহ দশা দেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং কর্মরত শ্রমিকদের প্রশ্ন করলে তারা আমতা আমতা করতে থাকে এবং কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
বিষয়টি নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে ভয় পেয়ে যায় দুর্নীতিবাজরা। বিল আটকে যাওয়ার ভয়ে ওই রাতেই তড়িঘড়ি করে বসানো টাইলসগুলো দেওয়াল থেকে আবার খুলে ফেলতে বাধ্য হয় ঠিকাদারের লোকজন। কিন্তু এত বড় ঘটনার পরও তাদের কোনো শিক্ষা হয়নি। পরের দিন সোমবার দুপুরে হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নার্সদের রুমে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও ঠিক একই কায়দায় চরম অনিয়ম করে টাইলস বসানোর কাজ চলছে। সরকারি কাজের তদারকি কতটা দুর্বল হলে তারা এমন সাহস পায়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন ও স্থানীয় এক প্রতিবাদী যুবক চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা যদি রাতে হাতেনাতে ধরে প্রতিবাদ না করতাম, তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অন্ধকারেই জেনোতেনোভাবে কাজ শেষ করে পুরো বিলের ১০০% টাকা তুলে নিয়ে সটকে পড়ত। এমন দায়সারা কাজের কারণে যেকোনো সময় দেওয়াল থেকে টাইলস খসে পড়ে ডাক্তার, নার্স বা রোগীদের মাথার ওপর পড়তে পারত, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তিনি আরও জানান, কয়েক দিন আগে এই হাসপাতালের ছাদ ঢালাইয়ের কাজেও এমন ব্যাপক চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়েছিল। তখন স্থানীয়দের বাধার মুখে কাজ সাময়িক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরে পরের দিন তারা নিয়ম মেনে সেই ঢালাইয়ের কাজ শেষ করে। এলাকাবাসী এই সরকারি হাসপাতালের সংস্কারকাজে একটি স্থায়ী ও শতভাগ স্বচ্ছ সমাধান চান।
একের পর এক এমন অনিয়মের বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া এবার বেশ কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানান, রবিবার রাতে কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। সোমবারও তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজের তদারকি করেন এবং পুনরায় সঠিক ও নিয়মমাফিক কাজ করার জন্য ঠিকাদারকে কড়া হুঁশিয়ারি দেন। বিষয়টি তিনি ইতিমধ্যে লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। রোগীর নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ধরনের ছাড় তিনি দেবেন না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় এবং মানুষের ক্ষোভের বিষয়টি নজরে আসার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান সরাসরি মাঠে নামেন। তিনি অভিযোগ পাওয়ার পরপরই নিজে সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। ইউএনও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দিয়েছেন, কাজের মানে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। সরকারি বাজেটের প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং শতভাগ মান বজায় রেখেই পুরো কাজ শেষ করতে হবে। নিয়মের বাইরে এক চুলও ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
এদিকে ঘটনা তদন্তে মঙ্গলবার সকালে মৌলভীবাজার জেলা থেকে ছুটে আসেন নির্বাহী স্বাস্থ্য প্রকৌশলী সুব্রত দেবনাথ। তিনি নিজে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ একদম পরিষ্কারভাবে পাওয়া গেছে। তবে তারা আসার আগেই দেওয়ালের ত্রুটিপূর্ণ টাইলসগুলো খুলে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তারা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়েছেন। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো এমন একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে যারা সরকারি টাকা লুটের চেষ্টা করেছে, তাদের ওপর এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখা হচ্ছে। কমলগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ দাবি জানিয়েছেন, শুধু সতর্কবার্তা নয়, এমন হরিলুটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।














