বাংলাদেশের কৃষিখাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রাগন ফলের চাষ এক বিশাল বিপ্লব নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অল্প জমিতে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক শিক্ষিত বেকার তরুণ ও সাধারণ কৃষক এই বিদেশি ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু কৃষকদের এই নতুন স্বপ্ন আর দিনরাতের হাড়ভাঙা খাটুনির পথে এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে চোরের উপদ্রব। অতি সম্প্রতি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নে এমন একটি দুঃসাহসিক চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার জন্ম হয়েছে। উচ্চমূল্যের ড্রাগন ফল চুরি করে পালানোর সময় স্থানীয় জনতার হাতে একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়েছে দুই ব্যক্তি।
স্থানীয় কৃষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি বড় ড্রাগন ফলের বাগানে দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত সুকৌশলে চুরির ঘটনা ঘটছিল। কৃষকরা রাতে পাহারা দিয়েও কোনোভাবেই এই চোর চক্রটিকে ধরতে পারছিলেন না। অবশেষে গত রাতে একটি বাগান থেকে বেশ কয়েকটি বস্তায় ড্রাগন ফল ভরে চুপিচুপি বেরিয়ে যাওয়ার সময় পাহারারত কৃষকদের চোখে পড়ে যায় ওই দুই ব্যক্তি। সাথে সাথে কৃষকরা চিৎকার শুরু করলে আশপাশের গ্রাম থেকে শত শত মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ছুটে আসেন। পালানোর কোনো পথ খোলা না পেয়ে ওই দুই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে যায়।
চোর হাতেনাতে ধরার পর সেই রাতের অন্ধকারেই পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিগত কয়েক মাস ধরে আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কৃষকদের পুঞ্জীভূত রাগ মুহূর্তের মধ্যেই গিয়ে পড়ে আটক হওয়া দুই ব্যক্তির ওপর। উত্তেজিত জনতা আর নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে তাদের আটকে রেখে বেধড়ক মারধর শুরু করে। এই তীব্র গণপিটুনিতে ওই দুই ব্যক্তি শারীরিকভাবে মারাত্মক আহত হয়। পরে খবর পেয়ে এলাকার কিছু সচেতন মানুষ ও জনপ্রতিনিধিরা ছুটে এসে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারা মুমূর্ষু অবস্থায় ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে জরুরি চিকিৎসার জন্য স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন।
কৃষকদের সাথে বিস্তারিত কথা বলে তাদের কষ্টের এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। তারা জানান, ড্রাগন ফল চাষ মোটেও কোনো সহজ কাজ নয়, এখানে প্রাথমিক খরচ অনেক বেশি। ভালো জাতের চারা কেনা, সিমেন্টের খুঁটি বসানো, সার দেওয়া আর বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা মিলিয়ে বিঘাপ্রতি কৃষকদের কয়েক লাখ টাকা নগদ বিনিয়োগ করতে হয়। বর্তমান পাইকারি বাজারে এক কেজি ভালো মানের ড্রাগন ফলের দাম প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ২.৫থেকে৩
ডলারের সমান। রাতের আঁধারে চোরেরা বাগানে ঢুকে শুধু ফলই চুরি করে না, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে দামি গাছগুলোও ভেঙে নষ্ট করে দেয়। এতে অনেক কৃষকের বার্ষিক আয়ের প্রায় ২০% থেকে ৩০% অংশ স্রেফ চুরির কারণেই লোকসান হয়ে যাচ্ছিল।
অনেক কৃষক ব্যাংক বা এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই ফলের বাগান করেছিলেন। চুরির কারণে তারা রীতিমতো পথে বসার উপক্রম হয়েছিলেন। মারধরের এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই মহেশপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পুলিশ গিয়ে প্রথমে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করে এবং পুরো এলাকার পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এরপর তারা ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করার কাজ শুরু করে। আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে পুলিশ স্থানীয়দের কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেয়।
এই পুরো ঘটনার বিষয়ে মহেশপুর থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পুলিশ খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট কৃষকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছে। অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন, অপরজনের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ হয়েছে। হাসপাতালে থাকা ব্যক্তিটি সুস্থ হয়ে রিলিজ পাওয়ার পরপরই পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন।
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার বক্তব্যে আরও জানান, স্থানীয় কৃষকরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন যে এই এলাকায় এমন ফল চুরির ঘটনা এর আগেও অনেকবার ঘটেছে, যা তাদের চরম আর্থিক সংকটে ফেলেছে। তাই পুলিশ এলাকার কৃষকদের কাছে আগের চুরির ঘটনাগুলোর বিস্তারিত তথ্য এবং সন্দেহভাজনদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দিতে বলেছে। পুলিশ ১০০% নিশ্চিত করেছে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং এই চুরির পেছনে কোনো বড় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র থাকলে তাদের সবাইকে খুব দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। কৃষকদের ঘামে ভেজা ফসলের স্বার্থ রক্ষা করতে এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে দিনরাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই চোর ধরার ঘটনার পর থেকে পুরো মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়ন এবং এর আশপাশের গ্রামগুলোতে এখন এটাই হাটে-ঘাটে প্রধান আলোচনার বিষয়। একদিকে চোর ধরা পড়ায় কৃষকরা কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন, অন্যদিকে তাদের মনে নতুন করে ভয়ও কাজ করছে। তারা দলবেঁধে রাত জেগে বাগান পাহারা দেওয়া শুরু করেছেন। সাধারণ কৃষকরা এখন সরকারের কাছে একটাই আশা করছেন, পুলিশ প্রশাসন যদি এই অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে, তবে ভবিষ্যতে আর কেউ কৃষকের বাগানে হাত দেওয়ার সাহস পাবে না। কষ্টার্জিত ফসল নিরাপদে ঘরে তুলতে পারলে তবেই একজন কৃষকের মুখে সত্যিকারের হাসি ফুটবে।














