গত মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি নিয়ে এক দীর্ঘ ও উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। সাধারণ মানুষের আমানত এবং ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদের ৬৮ নম্বর বিধি মেনে একটি নোটিশ উত্থাপন করেন। তাঁর নোটিশের মূল দাবি ছিল ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যবস্থাপনায় বাইরের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। এই নোটিশের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ব্যাংকের ভেতরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ লুটপাট, ঋণ জালিয়াতি এবং কর্মী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই ব্যাংকের নামের সঙ্গে ধর্মের আবেগ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শুধু নামের সঙ্গে ইসলাম শব্দ থাকলেই কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধর্মের সমার্থক হয়ে যায় না। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক মানেই ইসলাম নয়, ঠিক যেমন মির্জা ফখরুল ইসলাম বা জামায়াতে ইসলামী মানেও ইসলাম নয়। তাই নিজেদের রাজনৈতিক বা আর্থিক স্বার্থে সব জায়গায় ইসলামের দোহাই দেওয়া মোটেও ঠিক নয়। যারা আগে আজান ও তকবির দিয়ে ব্যাংকটি জোর করে দখল করেছিল, আজ সেই দখল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তাদের যে কতটা যাতনা হচ্ছে, তা সরকার ভালোই বুঝতে পারছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আলোচনার এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সব আর্থিক অনিয়মের তথ্য দেন। তিনি সংসদকে জানান, ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প বা আরডিএস ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মাঝে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার মূল্যমান প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার ($)। এর মধ্যে ৫ আগস্টের পর তড়িঘড়ি করে শুধু নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে এবং রাজনৈতিক সুবিধা নিতে নারীদের মাঝে নতুন করে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা বিলিয়ে দেওয়া হয়। এই টাকা কীভাবে কোথায় গেল, তা নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মনে এখন বিশাল প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ঋণ জালিয়াতির প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি নাবিল গ্রুপের নাম উল্লেখ করেন। তিনি জানান, নাবিল গ্রুপকে কোনো ধরনের নিয়মকানুন না মেনে শুধুমাত্র এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা বা প্রায় ৫৮ মিলিয়ন ডলার ($) ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই টাকা দিয়ে তারা বাজার থেকে মাল কিনে বিক্রি করে দিলেও ব্যাংকের কোষাগারে এক টাকাও ফেরত দেয়নি। এই বিপুল পরিমাণ টাকা কোথায় গেল, তার একটি চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিতও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, দুষ্টু লোকেরা বলছে নাবিল গ্রুপের সেই টাকা কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের নির্বাচনী তহবিলে ঢুকেছে এবং সেই চুরি করা টাকা দিয়ে তারা একটি আস্ত টিভি চ্যানেল খুলে বসেছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে নাবিল গ্রুপের কাছে ইসলামী ব্যাংকের মোট ব্যাংক দায়ের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই বিশাল অঙ্কের টাকার হিসাব বের করতে সরকার অবিলম্বে গভীর তদন্ত শুরু করবে।
এর পাশাপাশি নির্বাচনের ঠিক আগে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কোনো পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই লান্তাবুর গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার অভিযোগও তিনি তোলেন। ব্যাংকের টাকা কীভাবে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল কাজে নয়ছয় করা হয়েছে, তার উদাহরণ দিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের কল্যাণে খরচ করার জন্য যে সিএসআর বা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থাকে, সেখান থেকে ঢাকা-কক্সবাজারের বিমানের টিকিট পর্যন্ত কাটা হয়েছে। এসব হাস্যকর ও জঘন্য দুর্নীতির প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি ব্যাংকের কর্মী ব্যবস্থাপনায় রীতিমতো হরিলুট চলেছে বলে তিনি জানান। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোনো কারণ দর্শানো বা আইন না মেনেই ব্যাংক থেকে ৯ হাজার সাধারণ ও নিরীহ কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর বিপরীতে সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় ৬ হাজার নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের ব্যাংকিংয়ের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। শুধু তাই নয়, নিয়ম ভেঙে ১৩ হাজার কর্মীকে একসাথে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। যাদের যেখানে যাওয়ার কোনো কথা নয়, তাদের একসাথে দুই থেকে তিনটি করে প্রমোশন দিয়ে বড় বড় চেয়ারে বসানো হয়েছে।
ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ার নিয়ে বিরোধী দলের ডাকাতি করার অভিযোগেরও শক্ত জবাব দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, ইবনে সিনা তাদের হাতে থাকা ২ শতাংশ বা ২% শেয়ার ব্লক মার্কেটে তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা তুলে নিয়েছে। বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের হাতেই ব্যাংকের প্রায় ৮১% শেয়ার আটকে আছে। কেউ শেয়ার কীভাবে কিনেছে তা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করতে পারে বা মামলা হতে পারে। তবে শেয়ারহোল্ডার তো শেয়ারহোল্ডারই, সরকার বৈধ শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ১০০% রক্ষা করবে। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা লাখো কোটি টাকা পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নেতৃত্বে এসব পাচারের কঠোর তদন্ত হবে এবং যারা মানুষের জমানো টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সবশেষে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে চলা বিতর্কের অবসান ঘটান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সংসদকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সরকারকে জানিয়েছে যে নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং কোনো তদন্তও চলমান নেই। তবে ভবিষ্যতে নতুন কোনো শক্ত অভিযোগ এলে সরকার অবশ্যই তা খতিয়ে দেখবে। সাধারণ গ্রাহকের আমানত রক্ষা এবং ব্যাংক খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সরকার যে জিরো টলারেন্স বা ০% ছাড় দেওয়ার নীতিতে এগোচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য তারই প্রমাণ দেয়।














