বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই এক অন্যরকম উন্মাদনা, এক অদ্ভুত উৎসবের আমেজ। চায়ের দোকান, পাড়ার মোড় থেকে শুরু করে শহরের বড় বড় অফিস সব জায়গায় এখন একটাই আলোচনা, কবে শুরু হচ্ছে ফুটবলের এই বিশ্বযুদ্ধ। অপেক্ষার প্রহর প্রায় শেষ। আগামী ১১ জুন থেকে মাঠে গড়াচ্ছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বড় আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’। এবারই প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো যৌথভাবে এই বিশাল আসরের আয়োজন করছে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী অনেক ম্যাচ গভীর রাতে বা একেবারে ভোরে হলেও এদেশের ফুটবলপাগল দর্শকদের উত্তেজনায় যে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়বে না, তা চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়।
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও সর্ববৃহৎ আয়োজন হতে যাচ্ছে। এত দিন আমরা ৩২টি দেশের লড়াই দেখে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এবার বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা এক ধাক্কায় প্রায় ৫০% বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে মোট ৪৮টি দেশ। দলের সংখ্যা বাড়ায় ম্যাচের সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে। এবারের বিশ্বকাপে আমরা মোট ১০৪টি রোমাঞ্চকর ম্যাচ দেখার সুযোগ পাব। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি সত্যিই এক বিশাল আনন্দের খবর। দল বাড়ার কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক নতুন দেশ এবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাবে, যা টুর্নামেন্টকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলবে।
এত বড় একটি টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করতে আয়োজক দেশগুলো রীতিমতো পানির মতো টাকা খরচ করছে। ফিফার প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, স্পনসরশিপ, টিভি সম্প্রচার স্বত্ব এবং টিকিট বিক্রি থেকে এই বিশ্বকাপ রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় করবে। এই আয়ের পরিমাণ অনায়াসেই ১১ বিলিয়ন ডলার (১১,০০০,০০০,০০০)ছাড়িয়েযেতেপারে।অন্যদিকেযুক্তরাষ্ট্র,মেক্সিকোওকানাডাতাদেরস্টেডিয়ামগুলোরআধুনিকায়ন,উন্নতযাতায়াতব্যবস্থাএবংনিশ্ছিদ্রনিরাপত্তারপেছনেকয়েকবিলিয়নডলার(১১,০০০,০০০,০০০)ছাড়িয়েযেতেপারে।অন্যদিকেযুক্তরাষ্ট্র,মেক্সিকোওকানাডাতাদেরস্টেডিয়ামগুলোরআধুনিকায়ন,উন্নতযাতায়াতব্যবস্থাএবংনিশ্ছিদ্রনিরাপত্তারপেছনেকয়েকবিলিয়নডলার ব্যয় করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় টুর্নামেন্টের ১৬টি ভেন্যুকে দর্শকদের জন্য ১০০% নিরাপদ ও আরামদায়ক করে তোলা হয়েছে। লাখ লাখ পর্যটক এই ৩৯ দিনের উৎসবে সরাসরি মাঠে বসে খেলা দেখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
টুর্নামেন্টের সময়সূচি এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে ফিফা। ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই মহারণ শুরু হবে। এরপর ১১ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত চলবে গ্রুপ পর্বের তুমুল লড়াই। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ৪৮টি দলকে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হবে। প্রতিটি গ্রুপে থাকবে ৪টি করে দল। গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি পরের রাউন্ডে যাবে। এর পাশাপাশি পয়েন্টের ভিত্তিতে তৃতীয় স্থানে থাকা সেরা ৮টি দলও নকআউট পর্বে খেলার টিকিট পাবে। ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো চরম উত্তেজনায় ভরপুর থাকবে। দলগুলো নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে মাঠে লড়াই করবে।
গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার পর শুরু হবে নতুন সংযোজিত ‘রাউন্ড অব ৩২’। ২৮ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত এই রাউন্ডের হার্ডল পার হতে দলগুলোকে ঘাম ঝরাতে হবে। এরপর শুরু হবে সেই চিরচেনা ‘রাউন্ড অব ১৬’ বা শেষ ষোলোর লড়াই, যা চলবে ৪ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত। কোয়ার্টার ফাইনালের স্নায়ুচাপের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে ৯ থেকে ১১ জুলাই। এরপর ১৪ ও ১৫ জুলাই সেমিফাইনালের লড়াইয়ে নির্ধারিত হবে কারা যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ফাইনালে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি হবে ১৮ জুলাই। আর সবার স্বপ্নের মহাফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের বিশাল মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এই স্টেডিয়ামে প্রায় ৮২ হাজার দর্শক একসাথে বসে খেলা উপভোগ করতে পারবেন।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই মূলত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের একটি অঘোষিত লড়াই। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা কি লিওনেল মেসির জাদুতে তাদের শিরোপা ধরে রাখতে পারবে? নাকি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল তাদের দীর্ঘদিনের হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ করবে তা নিয়ে এদেশের দর্শকদের মাঝে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। এর পাশাপাশি ইউরোপের শক্তিশালী দল ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন এবং জার্মানিও শিরোপার জন্য মরণপণ লড়াই করবে। বাংলাদেশের অনেক ভক্ত এখনই নিজেদের প্রিয় দলের জার্সি কিনতে শুরু করেছেন। অনেকেই আবার বাড়ির ছাদে বিশাল পতাকা টানানোর জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাত জেগে খেলা দেখার জন্য দেশের তরুণরা এখন থেকেই নিজেদের রুটিন গোছাতে ব্যস্ত।
বিশ্বকাপের এই উন্মাদনা আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও দারুণ প্রভাব ফেলে। খেলা দেখার জন্য মানুষ নতুন টেলিভিশন কেনেন, অনেকে বড় প্রজেক্টর ভাড়া করেন। রাত জেগে খেলা দেখার সময় রেস্তোরাঁ ও ফুড ডেলিভারি সার্ভিসগুলোর বিক্রি প্রায় ৪০% থেকে ৫০% বেড়ে যায়। স্থানীয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ জার্সি তৈরি করে বাজারে ছাড়েন, যা দেশের অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক গতি আনে। ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার একটি অদ্ভুত মাধ্যম। উত্তর আমেরিকার মাটিতে ৩৯ দিনের এই ফুটবল উৎসব পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলবে।
৪৮টি দেশের ফুটবলাররা নিজেদের দেশের সম্মান রক্ষার জন্য মাঠে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেবেন। কে হাসবে শেষ হাসি? কার হাতে উঠবে সেই ঝলমলে সোনালি ট্রফি? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের সবাইকে ১৯ জুলাইয়ের সেই মহাফাইনাল পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আপাতত আমরা ১১ জুনের উদ্বোধনী বাঁশির আওয়াজ শোনার অপেক্ষায় দিন গুনছি। শুরু হোক দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ!














