বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) শুরু হলো এক নতুন যুগ। অ্যাডহক কমিটির পর এবার নির্বাচিত বোর্ডের বিসিবি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় দলের সাবেক সফল অধিনায়ক তামিম ইকবাল। যিনি মাত্র বছরখানেক আগেও পেশাদার ক্রিকেটে ব্যাট হাতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, আজ তিনি দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থার প্রধান। ক্লাব ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে পরিচালক হওয়ার পর, একক প্রার্থী হিসেবে অন্য পরিচালকদের সর্বসম্মত ভোটে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন।
বিসিবির নতুন এই পরিচালনা পর্ষদে মোট ২৫ জন পরিচালক নির্বাচিত ও মনোনীত হয়েছেন, যারা আগামী চার বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটের নীতিনির্ধারণ করবেন। এই ২৫ জনের মধ্যে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে ১২ জন, জেলা ও বিভাগীয় ক্যাটাগরি থেকে ১০ জন এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে ১ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ২ জন পরিচালককে সরাসরি মনোনীত করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। এই বৈচিত্র্যময় পর্ষদে যেমন অভিজ্ঞ সংগঠক আছেন, তেমনি নতুন মুখেরও অভাব নেই।
ক্লাব ক্যাটাগরিতে ৭৬ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৭৪ জন ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে রেকর্ড ৭৩টি ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছেন তামিম ইকবাল। তাঁর সাথে বিসিবির একমাত্র সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন আবাহনী লিমিটেডের কাউন্সিলর এবং একমি গ্রুপের অন্যতম স্বত্বাধিকারী ফাহিম সিনহা, যিনি ৬৬টি ভোট পেয়েছেন। বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণত দুজন সহসভাপতি থাকার কথা। তবে বোর্ড সভার পর তামিম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, পরিচালকদের সম্মতিতে আপাতত একজন সহসভাপতি রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরেকজনকে এই পদে আনা হবে। ফাহিম সিনহা এর আগেও পরিচালক ছিলেন এবং তামিমের নেতৃত্বে গঠিত সর্বশেষ অ্যাডহক কমিটিরও সদস্য ছিলেন।
ক্লাব ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭২টি করে ভোট পেয়েছেন ইসরাফিল খসরু এবং সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ। এই দুজনও সর্বশেষ ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। এক্সিউম ক্রিকেটার্স ক্লাবের কাউন্সিলর ইসরাফিল খসরু বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে এবং ফেয়ার ফাইটার্স স্পোর্টিং ক্লাবের সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭০টি ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো বিসিবি পরিচালক হয়েছেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের কাউন্সিলর এবং পরিচিত ক্রীড়া সংগঠক মাসুদুজ্জামান।
গত ৭ এপ্রিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) আগের আমিনুল ইসলামের বোর্ড ভেঙে দিয়ে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছিল। আগের বোর্ডের শেষ দিকে পদত্যাগ করা দুজন সদস্য মির্জা ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল (৬৮ ভোট) এবং শানিয়ান তানিম নাভিন (৬৬ ভোট) এবারও পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বসুন্ধরা রাইডার্সের কাউন্সিলর ইয়াসিরের বাবা আবুল কালাম কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য এবং একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। অন্যদিকে শানিয়ান তানিম ঢাকা মেরিনার ইয়াংস ক্লাবের কাউন্সিলর এবং বিপিএলের দল রংপুর রাইডার্সের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। এছাড়া ৫৩ ভোট পেয়ে পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন রফিকুল ইসলাম বাবু, যিনি আগেও পরিচালক এবং অ্যাডহক কমিটির সদস্য ছিলেন।
ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে প্রথমবারের মতো যারা পরিচালক হয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন—শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের আসিফ রব্বানি (৬৪ ভোট), আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের মির্জা ইয়াসির আব্বাস, পূর্বাচল স্পোর্টিং ক্লাবের সাকিফ আহমেদ সালাম এবং ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের অধ্যাপক ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম। এদের মধ্যে আসিফ রব্বানির বাবা গোলাম সিরাজ বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং ইয়াসির আব্বাসের বাবা মির্জা আব্বাস ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য। পেশায় চিকিৎসক ডা. শামীম সরকারপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং সাকিফ আহমেদ পেশায় একজন ব্যবসায়ী।
জেলা ও বিভাগীয় ক্যাটাগরি-১ এ ১০ জনের মধ্যে ৭ জন পরিচালক কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিলেন। ভোট হয়েছিল শুধু খুলনা ও বরিশাল বিভাগে। বরিশাল বিভাগ থেকে ৫ ভোট পেয়ে পরিচালক হয়েছেন বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি ফরচুন বরিশালের স্বত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান। খুলনা বিভাগে দুটি পদের জন্য তিনজন প্রার্থী ছিলেন, যেখানে ১০টি করে ভোট পেয়ে পরিচালক হয়েছেন খুলনার বিএনপি নেতা শফিকুল আলম এবং যশোরের শান্তনু ইসলাম।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত অন্যান্য পরিচালকদের মধ্যে ঢাকা বিভাগ থেকে আছেন সাইদ বিন জামান এবং আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ। চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীন এবং লক্ষ্মীপুরের মঈন উদ্দিন চৌধুরী। রংপুর থেকে ফয়সল আমীন, রাজশাহী থেকে মীর শাকরুল আলম এবং সিলেট থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী পরিচালক হয়েছেন।
ক্যাটাগরি-৩ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। এছাড়া এনএসসির মনোনীত দুজন পরিচালক হলেন বাগেরহাটের ব্যবসায়ী শেখ মোহাম্মদ রুহুল আমিন এবং সিলেটের সরফরাজ আহমেদ, যিনি আরাফাত রহমান কোকো ট্রাস্টের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন।
সব মিলিয়ে ২৫ সদস্যের এই নতুন বোর্ড বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরও পেশাদার ও শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করবে বলে আশাবাদী দেশের সাধারণ ক্রিকেট ভক্তরা।














