উচ্চশিক্ষার এক নতুন ভুবনে পা রাখল একঝাঁক স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণী। স্কুল ও কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা ডিগ্রি কলেজে পড়ার স্বপ্ন সব শিক্ষার্থীরই থাকে। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম দিনটি সব সময়ই একটু বেশি রঙিন আর আবেগের হয়। এমন এক আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে ঠাকুরগাঁও জেলার ঐতিহ্যবাহী পীরগঞ্জ সরকারি কলেজে অনুষ্ঠিত হলো নবীনবরণ বা ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের অনার্স বা স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নিতে রবিবার, ৭ জুন সকালে কলেজ ক্যাম্পাস সেজেছিল এক নতুন সাজে। এদিন সকাল থেকেই নতুন পোশাক আর চোখেমুখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ৩ শতাধিক নবীন শিক্ষার্থী কলেজ প্রাঙ্গণে জড়ো হন। তাদের পদচারণায় এবং তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে পুরো ক্যাম্পাস রীতিমতো মুখরিত হয়ে ওঠে।
কলেজের সুসজ্জিত হলরুমে এই জমকালো আয়োজনের সূচনা হয়। নতুন বন্ধুদের সাথে পরিচিত হওয়া, শিক্ষকদের প্রথম দেখা পাওয়া—সব মিলিয়ে হলরুমের পরিবেশ ছিল দারুণ প্রাণবন্ত। কলেজের প্রভাষক খন্দকার আরসাদুল বারীর অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। তিনি তাঁর জাদুকরী কথার মাধ্যমে নবীন শিক্ষার্থীদের মন জয় করে নেন এবং কলেজের বিভিন্ন নিয়মকানুন সম্পর্কে প্রাথমিক একটি সুন্দর ধারণা দেন। এরপর একে একে সম্মানীত অতিথিরা মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন এবং ফুলেল শুভেচ্ছার মাধ্যমে নবীনদের আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজের বিশাল পরিবারের একজন করে নেওয়া হয়।
এই সুন্দর আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পীরগঞ্জ সরকারি কলেজের সুযোগ্য অধ্যক্ষ প্রফেসর বদরুল হুদা। তিনি তাঁর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের জীবনের সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের প্রতি সবচেয়ে বেশি জোর দেন। নবীনদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শুধু বইয়ের পাতায় মুখস্থ বিদ্যা অর্জন করলেই চলবে না, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি কলেজের সুন্দর পরিবেশ রক্ষা করা এবং সব ধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি সবাইকে ১০০% শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কড়া নির্দেশ দেন। অধ্যক্ষ আরও বলেন, ছাত্রজীবনে শৃঙ্খলাই হলো সফলতার প্রথম ধাপ। যারা সময়কে মূল্য দেবে, তারাই জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে যুগোপযোগী উচ্চশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশের সরকার প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা খাতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করছে,যাতেগ্রামীণওমফস্বলএলাকারছেলেমেয়েরাওআধুনিকশিক্ষারআলোথেকেবঞ্চিতনাহয়।পরিসংখ্যানেদেখাযায়,পীরগঞ্জসরকারিকলেজেরমতোপ্রতিষ্ঠানগুলোরপ্রায়৬০)খরচকরছে,যাতেগ্রামীণওমফস্বলএলাকারছেলেমেয়েরাওআধুনিকশিক্ষারআলোথেকেবঞ্চিতনাহয়।পরিসংখ্যানেদেখাযায়,পীরগঞ্জসরকারিকলেজেরমতোপ্রতিষ্ঠানগুলোরপ্রায়৬০
থেকে ৫০০$ ডলার সমপরিমাণ টাকা খরচ হয়। সরকার ও কলেজ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার কারণে এই শিক্ষার্থীরা এখন অনেক সহজে নিজেদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে। শিক্ষকরা জানান, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো এই শিক্ষার্থীদের এমনভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা, যাতে তারা দেশ ও বিদেশের চাকরির বাজারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের ভর্তি কমিটির অত্যন্ত পরিশ্রমী আহ্বায়ক এবং সহযোগী অধ্যাপক সারোয়ার কবির। তিনি তাঁর বক্তব্যে অনার্স জীবনের চার বছরের দীর্ঘ যাত্রায় শিক্ষার্থীদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর একরামুল হক, সহযোগী অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক, সহযোগী অধ্যাপক এস. এম. রেজানুল্লাহ সরকার এবং সহযোগী অধ্যাপক গৌরাঙ্গ লাল সরকার। তারা সবাই নিজেদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নবীনদের নানা কার্যকরী পরামর্শ দেন। শিক্ষকরা নবীনদের বারবার মনে করিয়ে দেন, তারা যেন মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অহেতুক সময় নষ্ট না করে এখন থেকেই লাইব্রেরিতে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে।
কলেজের ভর্তি কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকবৃন্দ নবীনদের নিয়ে এক বিশাল আশার কথা শোনান। তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, এই নতুন ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ ভবিষ্যতে শিক্ষার গুণগত মানে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। গত কয়েক বছরে এই কলেজের শিক্ষার্থীদের পাসের হার আগের চেয়ে প্রায় ১৫% থেকে ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সত্যিই এলাকার মানুষের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক খবর। শিক্ষকরা চান, এই সফলতার ধারাবাহিকতা যেন নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও যেকোনো মূল্যে ধরে রাখে। তারা আশা করেন, এই শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফলই করবে না, বরং সমাজ থেকে মাদক ও অন্যান্য অপরাধ দূর করতেও বড় ভূমিকা পালন করবে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই বিশাল মিলনমেলায় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে পীরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নসরতে খোদা রানাসহ বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে পর্যবেক্ষণ করেন। সংবাদকর্মীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন সুন্দর আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনে পড়াশোনার প্রতি এক নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে। এলাকার সাংবাদিক সমাজ সব সময় শিক্ষার উন্নয়নে কলেজের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
দীর্ঘ বক্তৃতা ও পরিচিতি পর্ব শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা কলেজ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় দলবেঁধে আড্ডায় মেতে ওঠে। ক্যাম্পাসের সবুজ গাছপালার নিচে নতুন শিক্ষার্থীদের পদচারণা এক উৎসবের আমেজ তৈরি করে। সিনিয়র শিক্ষার্থীরাও নবীনদের খুব আন্তরিকতার সাথে বরণ করে নেয়। ৩ শতাধিক নবীন শিক্ষার্থী যখন হলরুম থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ও আনন্দ খেলা করছিল। প্রথম দিনের এই সুন্দর স্মৃতি নিয়ে তারা আগামী চার বছর এই ক্যাম্পাসে এক নতুন জীবনের গল্প লিখবে এবং নিজেদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেবে, শিক্ষক ও অভিভাবকদের এখন সেটাই মূল প্রত্যাশা।














