বেনাপোলে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ হামলা ও গুলিবর্ষণ: জীবনের নিরাপত্তায় সংবাদ সম্মেলন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। কিন্তু এখানকার ব্যবসায়ীদের জীবনের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে। রবিবার দুপুরে যশোর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনই এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন বেনাপোলের পরিচিত সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী সোহাগ হোসেন। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে তিনি এই সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি জানান, পাওনা টাকা চাওয়ার জেরে চিহ্নিত কিছু সন্ত্রাসী তাকে হত্যার জন্য তার ভাড়া বাসায় এই সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সোহাগ হোসেন ঘটনার রাতের এক রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। গত ৫ জুন রাত তখন আনুমানিক ১০টা। সারাদিনের কাজ শেষে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজের ভাড়া বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই ১০ থেকে ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল তার বাসার সামনে এসে হাজির হয়। তারা এসেই সোহাগ হোসেনকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে এবং তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের জানালা ও দরজা লক্ষ্য করে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গুলির বিকট শব্দে পুরো এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

গুলির ওই ভয়ংকর মুহূর্তের কথা স্মরণ করে সোহাগ হোসেন শিউরে ওঠেন। তিনি জানান, হামলাকারীদের ছোড়া একটি তাজা গুলি জানালার কাচ ভেঙে সরাসরি ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে এবং সজোরে দেয়ালে গিয়ে আঘাত করে। এছাড়া আরও কয়েকটি গুলি ঘরের দরজাসহ বিভিন্ন স্থানে লাগে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ঘরের সব লাইট অফ করে দেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়েন। এই সামান্য উপস্থিত বুদ্ধির কারণেই সে রাতে তারা প্রাণে বেঁচে যান। আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও, মানসিকভাবে তারা এখন চরম বিপর্যস্ত। এই ঘটনার পর থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানরা চরম আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন।

এই পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার পেছনের কারণ হিসেবে একটি বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের কথা উল্লেখ করেন সোহাগ হোসেন। তিনি জানান, সাইদ নামের এক ব্যক্তির কাছে তিনি এবং তার ব্যবসায়িক পার্টনার পাওনা হিসেবে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা পান। বর্তমান বাজারের রেট হিসাব করলে এই টাকার পরিমাণ প্রায় ৭২,০০০$ (ডলার) এর কাছাকাছি। এই বিশাল অঙ্কের পাওনা টাকা যাতে ফেরত দিতে না হয়, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই সাইদ এই সন্ত্রাসী চক্রকে ভাড়া করেছে। এই হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেয় সাইদের শ্যালক আশা। আর তার সাথে ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগের চিহ্নিত কয়েকজন সশস্ত্র ক্যাডার। তারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে বলে সোহাগ দাবি করেন।

এত বড় একটি ঘটনার পরও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন এই সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী। তিনি জানান, ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুলির খোসাসহ বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, পুলিশ এখন পর্যন্ত এই হামলার সাথে জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি। সোহাগ হোসেন বলেন, বাসার আশপাশ ও ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো আছে। পুলিশ যদি আন্তরিকতার সাথে সেই সিসিটিভি ফুটেজগুলো সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করে, তাহলে খুব সহজেই এই হামলাকারীদের পরিষ্কারভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। তিনি দ্রুত এই ফুটেজগুলো খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান।

যশোর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সোহাগ হোসেনের সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন আইয়ুব হোসেন এবং রফিকুল ইসলাম রয়েল। তারাও এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দ্রুত আসামিদের আইনের আওতায় আনার দাবি করেন। বেনাপোলের মতো একটি ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এলাকায় এমন প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ব্যবসায়ীদের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বন্দরের প্রায় ১০০% ব্যবসায়ী যদি এমন আতঙ্কের মধ্যে কাজ করেন, তবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

সোহাগ হোসেন প্রশাসন ও সরকারের কাছে তার পরিবারের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আকুল আবেদন জানান। পাওনা ৮৫ লাখ টাকা উদ্ধার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালে যেকোনো সময় তারা আবারও বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি দ্রুত এই সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ