ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ এখন সীমান্তে এক ভয়ংকর অমানবিক খেলায় মেতে উঠেছে। তারা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে জোর করে ধরে এনে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিএসএফ প্রতিনিয়ত দাবি করছে এরা সবাই অবৈধ বাংলাদেশি। এমন অমানবিক কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস বা এপিডিআর। তারা জানিয়েছে, বিএসএফের এই জোরজুলুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আগামী ১১ জুন মালদা শহরে একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করবে তাদের সংগঠন। সংগঠনের সহসভাপতি রঞ্জিত শূর আজ রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা সবার সামনে তুলে ধরেন এবং অবিলম্বে এই ঘৃণ্য কাজ বন্ধ করার জোর দাবি জানান।
পশ্চিমবঙ্গে সদ্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। সেখানে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি। তারা তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় এবং ইশতেহারে খুব পরিষ্কার করে লিখেছিল, ক্ষমতায় এলে তারা ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’—এই ৩-ডি নীতি বা চিহ্নিতকরণ, ফেরত পাঠানো এবং মুছে ফেলার কাজ শুরু করবে। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরপরই এই নীতি বাস্তবায়নে সরাসরি মাঠে নামেন। তিনি বিএসএফকে বিপুল পরিমাণ জমি বুঝিয়ে দিয়েছেন যাতে তারা বড় বড় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটককেন্দ্র বানাতে পারে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এসব আটককেন্দ্র তৈরিতে সরকার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করছে। সেখানে সন্দেহভাজন কথিত বাংলাদেশিদের আটকে রেখে পরে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করার এক সুদূরপ্রসারী ও অমানবিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তারা। আর এই নীতির কারণেই এখন দুই দেশের সীমান্তের সাধারণ মানুষ চরম বিপদে পড়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর এই ঘটনাকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা জানায়, রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে বিএসএফ সন্দেহভাজন মানুষদের ধরে সীমান্তে নিয়ে আসছে। এই মানুষদের মধ্যে প্রায় ৮০% থেকে ৯০% নারী ও একেবারে ছোট ছোট শিশু। বিএসএফ তাদের বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ভয় দেখিয়ে জোর করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওপারে থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি তাদের কোনোভাবেই আমাদের দেশের সীমানার ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। বিজিবির কড়া পাহারার কারণে ওই অসহায় মানুষেরা এখন মাঝপথে আটকে পড়েছেন। তারা না পারছেন সামনে এগোতে, না পারছেন পেছনে ফিরে যেতে।
দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এই অনড় অবস্থানের কারণে বহু জায়গায় ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা জিরো পয়েন্টে দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন শত শত মানুষ। এদের মধ্যে অনেক গর্ভবতী নারী ও একেবারে ছোট ছোট শিশুও রয়েছে। খাঁ খাঁ রোদে পুড়ে এবং বৃষ্টিতে ভিজে তারা এক চরম মানবেতর জীবন পার করছেন। তাদের কাছে কোনো খাবার নেই, খাওয়ার মতো এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি পর্যন্ত নেই। সারাদিন ক্ষুধার জ্বালায় শিশুরা কাঁদছে। প্রতিদিন তারা একটু একটু করে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আধুনিক যুগে এসে চোখের সামনে এমন অমানবিক দৃশ্য সত্যিই মেনে নেওয়া অনেক কঠিন।
বিএসএফ এই অসহায় মানুষদের জিরো পয়েন্টে ঠেলে দিয়ে নিজেদের সব দায়িত্ব অস্বীকার করছে। তারা খুব পরিষ্কার করে বলছে, এরা সবাই অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক, তাই এদের প্রতি ভারতের কোনো আইনি দায়িত্ব থাকতে পারে না। উল্টো দিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি বলছে, এরা যে বাংলাদেশি নাগরিক, তার স্বপক্ষে বিএসএফ কোনো আইনি বা দাপ্তরিক প্রমাণ দিতে পারেনি। বিজিবির মতে, এরা সবাই ভারতীয় নাগরিক। তাই তাদের বাংলাদেশে ঢোকার কোনো প্রশ্নই আসে না। দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর এমন রেষারেষি এবং বন্দুকের নলের মাঝখানে পড়ে খাবার ও পানি ছাড়া এই মানুষগুলো এখন এক ভয়ংকর ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।
ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্তের বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর পয়েন্টে এখন ঠিক একই রকম অবস্থা বিরাজ করছে। এপিডিআর মনে করে, ভারতের বর্তমান রাজ্য সরকারের এই ‘থ্রি ডি’ নীতি পুরোপুরি অসাংবিধানিক এবং চরম বেআইনি। ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ভারতের সীমানার ভেতরে থাকা যেকোনো ব্যক্তির সমান মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। আবার ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার ১০০% নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অথচ বিএসএফ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার আইনই প্রতিদিন চরমভাবে লঙ্ঘন করছে। রাষ্ট্র তার নিজের তৈরি করা আইন এভাবে ভাঙতে পারে না বলে সংগঠনটি মনে করে।
সংবিধান লঙ্ঘন করে চলা ভারতের এই অমানবিক ‘থ্রি ডি’ নীতি অবিলম্বে বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছেন এপিডিআরের সহসভাপতি রঞ্জিত শূর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নো ম্যানস ল্যান্ড বা জিরো পয়েন্টে বিএসএফ যেসব অসহায় মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলে এসেছে, ভারত সরকারকে অবিলম্বে তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। মানবতার বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপরাধ সৃষ্টিকারী পুশ ব্যাক নীতি কোনোভাবেই সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় এপিডিআর এখন জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বা ইউএনএইচআরসির সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে। তারা চায় জাতিসংঘ দ্রুত এই বিষয়ে নজর দিক এবং অসহায় মানুষগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ভারত সরকারকে চাপ দিক।














