চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী জেলা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই সীমান্ত পথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা প্রায়ই অবৈধভাবে দেশে মাদক ঢোকানোর চেষ্টা করে। মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখতে এবার কঠোর অবস্থানে গেছে জেলা পুলিশ। শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত সদর মডেল থানা এলাকায় এক বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে পুলিশ মোট ২১ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের এই সাহসী ও ঝটিকা অভিযান এলাকার সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল স্বস্তি এনে দিয়েছে।
এই বিশেষ অভিযানের সরাসরি নেতৃত্ব দেন জেলা পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস। তার নির্দেশে ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে মাঠে থেকে কাজ করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) এস.এম. ওয়াসিম ফিরোজ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবাবগঞ্জ সদর সার্কেল) মো. ইয়াসির আরাফাত এবং সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. একরামুল হোসাইন। শুক্রবার সন্ধ্যা ঠিক সাড়ে ৭টার দিকে তারা বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে বেশ কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে যান। এরপর শহরের বিভিন্ন সন্দেহভাজন পয়েন্ট, বস্তি ও মাদকের আখড়াগুলোতে তারা একযোগে তল্লাশি শুরু করেন। পুলিশের এই আকস্মিক পদক্ষেপে অপরাধীরা পালানোর কোনো সুযোগই পায়নি।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ২১ জনের অপরাধের ধরন বেশ আলাদা। পুলিশ একেবারে হাতেনাতে ৬ জন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং ১০ জন মাদকসেবীকে ধরেছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে থাকা সিআর মামলার সাজাপ্রাপ্ত ১ জন, বিভিন্ন মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ৩ জন এবং নিয়মিত একটি মামলার ১ জন আসামিকে তারা আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সীমান্ত দিয়ে আসা এই অবৈধ মাদক ব্যবসার কারণে প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% কিশোর অপরাধ এবং পারিবারিক কলহের পেছনে এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তাই এই অপরাধীদের ধরাটা সুস্থ সমাজের জন্য খুবই জরুরি ছিল।
অভিযানের সময় পুলিশ শুধু অপরাধীদের ধরেই দায়িত্ব শেষ করেনি, বরং দ্রুত আইনি শাস্তির ব্যবস্থাও করেছে। শহরের একটি জায়গায় পৃথক অভিযান চালিয়ে পুলিশ ২ জন ব্যক্তিকে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক করে। এরপর সময় নষ্ট না করে তাদের সাথে সাথেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সাক্ষ্য ও প্রমাণ যাচাই করে অপরাধীদের একজনকে ২১ দিনের এবং অপরজনকে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। এলাকার সাধারণ মানুষ মনে করেন, এমন তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা যদি সারা বছর চালু থাকে, তবে অপরাধীরা মনে ভয় পাবে এবং অপরাধ করার আগে অন্তত দশবার চিন্তা করবে।
পুলিশ এই দীর্ঘ অভিযানে অপরাধীদের গোপন আস্তানা থেকে বেশ কিছু মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। তারা তল্লাশি চালিয়ে ৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৫০০ গ্রাম গাঁজা এবং ২০ লিটার দেশীয় তৈরি চোলাই মদ জব্দ করে। পরিমাণে হয়তো এগুলো খুব বিশাল কোনো চালান নয়, কিন্তু পাড়া-মহল্লায় এই ছোট ছোট মাদকের পুরিয়াগুলোই উঠতি বয়সের তরুণদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। একজন শিক্ষার্থী যখন মাদকে আসক্ত হয়, তখন তার পরিবার আর্থিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। অনেক পরিবার সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। পুলিশ উদ্ধার করা এই মাদকগুলো বাজেয়াপ্ত করেছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে এগুলো জনসমক্ষে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেবে।
সদর মডেল থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে তারা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অন্যান্য প্রচলিত আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করছেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের আদালতে পাঠানো হবে। পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস এলাকার মানুষকে কথা দিয়েছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত তাদের এই অভিযান থামবে না। সমাজ থেকে মাদক দূর করতে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। এলাকার মানুষ যদি ভয় না পেয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে, তবে আমাদের সমাজ থেকে ১০০% মাদক নির্মূল করা খুব সহজেই সম্ভব হবে।














