বাংলাদেশের লালমনিরহাট, পঞ্চগড় এবং নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ৬০ জনকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। কিন্তু বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কড়া প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের সেই চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই মানুষগুলোকে বিজিবি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি, আবার ভারতও তাদের ফেরত নিচ্ছে না। ফলে এই অসহায় মানুষগুলো এখন দুই দেশের সীমান্তের শূন্যরেখা বা নো ম্যান্স ল্যান্ডে খোলা আকাশের নিচে তীব্র গরম ও বৃষ্টির মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একাধিকবার পতাকা বৈঠক হলেও এই সংকটের কোনো সমাধান এখনো বের হয়নি।
সীমান্তের এই উত্তেজনা শুরু হয় মূলত বৃহস্পতিবার রাত থেকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিজিবি একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর ১০টি পৃথক চেষ্টা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৯০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করার চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুশ ইনের চেষ্টা হয়েছে লালমনিরহাট জেলায়। লালমনিরহাটের আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার চারটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর কড়া পাহারার কারণে তারা ভেতরে ঢুকতে পারেনি। আজ সকালে এই ৩৩ জনকে নিজেদের লাগেজসহ শূন্যরেখায় বসে থাকতে দেখা যায়।
লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানায়, আদিতমারী উপজেলার দীঘলটারী ও দুর্গাপুর সীমান্তে ১২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির উপস্থিতি টের পেয়ে বিজিবি তাদের হ্যান্ডমাইকে সতর্ক করে। এরপর তাদের পরিচয় জানতে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানালেও ভারত কোনো সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া সীমান্ত দিয়ে ১১ জনকে এবং পাটগ্রামের ঝালাঙ্গী সীমান্ত দিয়ে আরও ১০ জনকে জোর করে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। কিন্তু বিজিবির কড়া পাহারায় তা ব্যর্থ হয়। তিস্তা-৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর তানভীর আহমেদ জানান, তারা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কাউকে অবৈধভাবে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
উত্তরের আরেক জেলা পঞ্চগড়েও একই ঘটনা ঘটেছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি–প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ ১০ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তারা শূন্যরেখার ফসলি জমিতে বসে ছিলেন। এদের মধ্যে ৫ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও ৩ জন শিশু রয়েছে। আজ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে একটি দীর্ঘ পতাকা বৈঠক হয়। নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিরাজুল ইসলাম বলেন, বৈঠকে বিএসএফ দাবি করেছে যে এই ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিক। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ তারা দিতে পারেনি। তাই বিজিবি তাদের গ্রহণ করেনি। শনিবার আবার ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে বৈঠক হবে।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাপানিয়া সীমান্তেও আজ সকালে ১৭ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম জানান, খবর পেয়ে বিজিবির টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়। বর্তমানে ওই এলাকায় বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কোনোভাবেই এই ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে গত বুধবার রাতে বিএসএফ ২৮ জনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। বিজিবির বাধায় তারা এখনো শূন্যরেখায় আটকে আছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে ভারী বৃষ্টিতে এই মানুষগুলো ভিজেছেন এবং তাদের কাছে পর্যাপ্ত খাবার নেই। জানা গেছে, এই ২৮ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি খুলনার কয়রায়, যারা দুই বছর আগে অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন। বিজিবি ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক জানান, বৃহস্পতিবারের পতাকা বৈঠকে বিএসএফ পুশ ইনের কথা স্বীকার করলেও পরে তারা আর কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। বিজিবির রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কামাল হোসেন সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে পুশ ইন ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।














