ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খালিশপুর বাজার এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় এক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতি শুক্রবার সকালের আলো ফোটার সাথে সাথেই এই বাজার একেবারে অন্য রকম এক রূপে সেজে ওঠে। চারপাশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো থেকে ভ্যান, করিমন আর নছিমনে করে কৃষকরা সারি সারি কলার কাঁদি নিয়ে এই হাটে হাজির হন। কাঁচা ও পাকা কলার সবুজে ঘেরা এই হাটের দৃশ্য যে কারও মন জুড়িয়ে দেয়। এই হাট শুধু এলাকার সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং এটি এখন পুরো অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। এখান থেকেই প্রতিদিন সারি সারি ট্রাকে বোঝাই হয়ে বিভিন্ন প্রজাতির কলা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে।
অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে এই কলার হাট বিশাল এক ভূমিকা রাখছে। প্রতি সপ্তাহের হাটে এখানে লাখ লাখ টাকার কলা কেনাবেচা করেন ব্যাপারী ও কৃষকরা। আন্তর্জাতিক বাজারের হিসেবে এই লেনদেনের পরিমাণ অনায়াসেই কয়েক হাজার ডলার ($) ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এই এলাকার প্রায় ৭০% থেকে ৮০% কৃষক সরাসরি কলা চাষের সাথে যুক্ত। আগে তাদের উৎপাদিত কলার সঠিক বাজার ছিল না, কিন্তু খালিশপুর হাট বড় হওয়ার পর থেকে তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হাটের দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে পুরো এলাকা মুখরিত থাকে।
খালিশপুরের এই হাটে কলা বিক্রি করতে আসা স্থানীয় চাষি আব্দুর রহিম নিজের জীবনের পরিবর্তনের গল্প শোনান। তিনি অত্যন্ত হাসিমুখে বলেন, সারা বছর তারা অনেক রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রচুর পরিশ্রম করে কলা ফলাই। আগে কলা নিয়ে তাদের এদিক-ওদিন বিভিন্ন হাটবাজারে ঘুরতে হতো। ফড়িয়াদের কারণে তখন তারা কলার সঠিক দামও পেতেন না। কিন্তু এখন খালিশপুর হাটে কলার অনেক বেশি চাহিদা তৈরি হয়েছে। ঢাকা থেকে বড় বড় ব্যাপারীরা আসেন, তাই কৃষকরা এখন কলার ন্যায্য দাম পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, নিজের হাতের ঘামে ফলানো কলা চোখের সামনে ট্রাক ভরে চলে যেতে দেখলে তার সব পরিশ্রম সার্থক মনে হয়। এই হাটের কারণে আব্দুর রহিমের মতো হাজারো কৃষক আজ আর্থিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছেন।
শুধু বিক্রেতারাই নন, এই হাট থেকে কলা কিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া পাইকারি ব্যবসায়ীরাও বেশ খুশি। ঢাকা থেকে আসা বড় পাইকারি ব্যবসায়ী মো. সোলাইমান হোসেন এই হাটের কলার অনেক প্রশংসা করেন। তিনি জানান, খালিশপুরের কলার মান দেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেক ভালো। এখানে চম্পা, সাগর, মেহেরসাগর ও সবরি কলার মতো বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর কলা খুব সহজেই পাওয়া যায়। এখান থেকে তাজা কলা কিনে তারা ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে পাঠান। এখানকার যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো হওয়ায় তাদের ব্যবসা করতে খুব সুবিধা হয়। পাশাপাশি এখানকার স্থানীয় কৃষকরাও খুব আন্তরিক আচরণ করেন, যে কারণে তারা প্রতি শুক্রবার নিয়ম করে এই হাটে কলা কিনতে ছুটে আসেন।
তবে এত সম্ভাবনা ও সফলতার পরও এই হাটে বেশ কিছু বড় সমস্যা রয়ে গেছে। খালিশপুর এলাকার সচেতন নাগরিক ও সমাজকর্মী মো. আসাদুল ইসলাম হাটের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি মনে করেন, খালিশপুর কলার হাট ধীরে ধীরে পুরো এলাকার অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই হাটের ভৌত বা অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন এখনো হয়নি। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন যদি এখানে একটি আধুনিক শেড এবং একটি বড় কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারের ব্যবস্থা করে দেয়, তবে কৃষকরা অনেক বড় বিপদের হাত থেকে বাঁচবেন।
বর্তমানে হিমাগার না থাকায় এবং অনেক সময় গাড়ি পেতে দেরি হলে প্রায় ১০% থেকে ১৫% কলা পচে নষ্ট হয়ে যায়। এতে কৃষকদের অনেক সময় শত শত ডলার ($) লোকসান গুনতে হয়। কোল্ড স্টোরেজ থাকলে কৃষকরা তাদের কলার আরও ভালো দাম পেতেন এবং এই বিশাল অপচয় খুব সহজেই ঠেকানো যেত। আসাদুল ইসলাম আরও জানান, এই হাট শুধু কৃষকদেরই নয়, কুলি, দিনমজুর ও ট্রাকচালকসহ এলাকার হাজারো মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।
প্রতি শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে একেবারে দুপুর পর্যন্ত। খালিশপুর কলার হাট এখন শুধু একটি সাধারণ ব্যবসার জায়গা বা বাজার হিসেবে আটকে নেই। এটি এখন প্রত্যন্ত গ্রামের অসহায় কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের এক সফল ও উজ্জ্বল মানচিত্রে পরিণত হয়েছে। সরকারের একটু সুদৃষ্টি এবং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আগামী দিনে এই কলার হাট বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।














