ঝিনাইদহের শৈলকুপায় গ্রাম্য আধিপত্য নিয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ, আহত অন্তত ৬০

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলায় গ্রাম্য আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার সকাল আটটার দিকে উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামে এই বিশাল মারামারির ঘটনা ঘটে। সকালের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যেই যেন এক ভয়ংকর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের কমপক্ষে ৬০ জন মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। রক্তাক্ত ও জখম হওয়া মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছেন স্থানীয়রা।

পুলিশ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিষ্ণুপুর গ্রামে একদিনে এই সংঘাত তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় দলাদলি ও ক্ষমতার লড়াই চলছে। মূলত বর্তমান ইউপি সদস্য কফিল বিশ্বাস এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমানের সমর্থকদের মধ্যে এই উত্তেজনা চলে আসছিল। গ্রামে কার কথা বেশি চলবে, কার ক্ষমতা বেশি এ নিয়েই তাদের মূল বিরোধ। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা মারামারির প্রায় ৮০% ঘটনার পেছনেই থাকে এই আধিপত্য বিস্তারের নোংরা চেষ্টা। সাধারণ কৃষকদের ব্যবহার করে স্থানীয় নেতারা নিজেদের ক্ষমতা জাহির করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ এবং গ্রামের স্বাভাবিক উন্নয়ন ১০০% বাধাগ্রস্ত হয়।

বৃহস্পতিবার সকালে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে প্রথমে সাধারণ কথাকাটাকাটি শুরু হয়। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই তর্কবিতর্ক চরম আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা, লোহার রড, রামদা, ইটপাটকেল এবং দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চলা এই ভয়াবহ সংঘর্ষে পুরো এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গ্রামের নারী ও শিশুরা ভয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি শুরু করেন। অনেকেই নিজেদের জীবন বাঁচাতে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে লুকিয়ে থাকেন।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও হামলায় অন্তত ৬০ জন আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারদিকে শুধু মানুষের আর্তনাদ ও রক্তের দাগ দেখা যায়। আহতদের মধ্যে মতিয়ার রহমানের সমর্থক মিরাজ জোয়ার্দ্দার, আবু তালেব, ফজলু মণ্ডল, নিয়াজ মণ্ডল, শাহজাহান মণ্ডল, শামীম মণ্ডল, শাহীন মণ্ডল, চিনিরুদ্দিন, মজনু বিশ্বাস ও জহুরুল মণ্ডলের নাম জানা গেছে। অন্যদিকে কফিল বিশ্বাসের সমর্থকদের মধ্যে রোকন উদ্দিন, মো. সানজু, মো. আকিজ, মো. আনিচ, মো. মফিজুল, মো. মোশারফ মিয়া, আফজাল মোল্লা, মো. হাবিব মোল্লা ও মো. শাকিব গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের অনেকের শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে।

এত বিপুলসংখ্যক আহত মানুষকে একসাথে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে এক চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে একসাথে ৬০ জন রোগীকে সামলাতে ডাক্তার ও নার্সরা রীতিমতো হিমশিম খান। গ্রামগঞ্জে এমন মারামারির কারণে সাধারণ গরিব মানুষদের চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। চিকিৎসা করাতে গিয়ে একেকটি পরিবারকে অনেক সময় ২থেকে৫০০(ডলার) বা ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ধারদেনা করতে হয়, যা তাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়। অনেক দিনমজুর কয়েক সপ্তাহ কাজ করতে পারেন না, ফলে তাদের পরিবারে না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়।

এই বর্বরোচিত হামলার বিষয়ে দুই পক্ষই একে অপরের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। ইউপি সদস্য কফিল বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেন, বৃহস্পতিবার সকালে তার লোকজন যার যার বাড়িতেই শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিল। মতিয়ারের সমর্থকরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে হঠাৎ করেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার সমর্থকদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। এরপরই মূলত আত্মরক্ষার্থে দুই পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ বেধে যায়। তিনি জানান, এই হামলায় তার পক্ষের প্রায় ৪০ জন সমর্থক মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন এবং তিনি হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।

অন্যদিকে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার বিশ্বাস কফিল বিশ্বাসের সব অভিযোগ সরাসরি মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তিনি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, কফিল দীর্ঘদিন ধরে বিষ্ণুপুর এলাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানাভাবে অশান্তি সৃষ্টি করে আসছে। বৃহস্পতিবার সকালে ঠিক কী বিষয় নিয়ে মাঠে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে, তা তিনি নিজে নিশ্চিতভাবে জানেন না। তবে তিনি দাবি করেন, প্রতিপক্ষের হামলায় তার পক্ষের অন্তত ২৫ জন সমর্থক জখম হয়েছেন। সাধারণ মানুষের মতে, নেতাদের এই রেষারেষির বলি হচ্ছেন গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।

খবর পেয়ে শৈলকুপা থানা পুলিশ দ্রুত বিপুলসংখ্যক সদস্য নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। শৈলকূপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ন কবির মোল্লা জানান, পূর্ব বিরোধের জের ধরেই দুই পক্ষের মধ্যে এই বিশাল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গ্রামে যাতে নতুন করে আর কোনো সংঘাত না ঘটে, সে জন্য বিষ্ণুপুর গ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি শক্ত ভাষায় জানান, এই ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেবে। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করেনি। পুলিশ অপরাধীদের ধরতে মাঠে কাজ করছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ