এক বছরেরও বেশি সময় পর কারামুক্ত সেলিনা হায়াৎ আইভী: গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জে আনন্দ-উচ্ছ্বাস

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারের চারদেয়ালের ভেতর বন্দী জীবন কাটানোর পর অবশেষে জামিনে মুক্ত হয়ে নিজের চেনা শহরে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। বুধবার রাত সোয়া ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশাল ফটক পেরিয়ে তিনি মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেন। আইনি সব প্রক্রিয়া শেষ করে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় নিজের প্রিয় বাসভবনে এসে পৌঁছান। রাত তখন বেশ গভীর, কিন্তু দেওভোগ এলাকার সাধারণ মানুষের চোখে বিন্দুমাত্র কোনো ঘুম ছিল না। তাদের প্রিয় মেয়রের এই ফেরার খবরে পুরো এলাকায় এক উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়।

কারামুক্তির খবর পেয়ে বুধবার রাত ১১টা থেকেই তার বাড়ির সামনে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং শত শত কর্মী-সমর্থক ভিড় জমাতে শুরু করেন। সবার মনে প্রায় ১০০% দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আইনি লড়াইয়ে জিতে আইভী ঠিকই সসম্মানে তাদের মাঝে ফিরে আসবেন। দীর্ঘদিন পর তাকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে কর্মী-সমর্থকদের মাঝে এক অন্যরকম স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। তারা স্লোগান দিয়ে, হাততালি দিয়ে এবং ফুল ছিটিয়ে তাদের প্রিয় নেত্রীকে বরণ করে নেন। এ সময় অনেককে আনন্দে কাঁদতে দেখা যায়।

বাসায় পৌঁছানোর পর সেলিনা হায়াৎ আইভী কিছুটা ক্লান্ত থাকলেও উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি তার গভীর কৃতজ্ঞতার কথা জানান। তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “আমি দেশের বিচার বিভাগের প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, কারণ তারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন। একই সাথে বর্তমান সরকারের প্রতিও আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমি মন থেকে চাই, সবাইকে নিয়ে দেশে একটি সত্যিকারের মানবিক সরকার গঠিত হোক।” নিজের কারাজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, “কারাগারে আমার মতো আরও অনেক অসহায় মা বন্দী আছেন, যারা সম্পূর্ণ নিরপরাধ। আমি আশা করছি, সরকার সেই নিরপরাধ মায়েদের প্রতিও ১০০% সদয় আচরণ করবে এবং খুব দ্রুত তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে।”

আইভীর এই দীর্ঘ ও কষ্টকর কারাবাসের শুরুটা হয়েছিল গত ২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে। ওই দিন পুলিশ তাকে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাকে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের সময়ের বেশ কয়েকটি মামলায় জড়ান। পুলিশ তাকে ৩টি হত্যা মামলা ও ২টি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ সর্বমোট ১২টি কঠিন ও জটিল মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। আইনি লড়াই করতে গিয়ে তার পরিবারকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের বড় রাজনৈতিক ও হত্যা মামলাগুলো লড়তে গেলে আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে পরিবারের অনেক সময় হাজার হাজার ডলার ($) বা লাখ লাখ টাকা অনায়াসে খরচ হয়ে যায়, যা যেকোনো সাধারণ মানুষের জন্যই বিরাট একটি আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি করে। তার আইনজীবীরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে, এসব মামলার অন্তত ৯০% ভিত্তিহীন এবং শুধুই হয়রানিমূলক।

কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি কয়েকটি মামলায় একাধিকবার জামিন পেয়েছিলেন। কিন্তু যখনই তিনি একটি মামলায় জামিন পেতেন, তখনই পুলিশ তাকে নতুন আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখাত। এভাবে নতুন মামলা দিয়ে প্রশাসন তার মুক্তির পথ বারবার আটকে দিচ্ছিল। অবশেষে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আইনি লড়াই শেষে গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। এই জামিনের মাধ্যমেই মূলত তার কারামুক্তির চূড়ান্ত পথ খুলে যায়। বুধবার রাতে মুক্তির সময় কারাফটকে তার আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থেকে তাকে পরম মমতায় গ্রহণ করেন।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রভাবশালী একটি নাম। তিনি ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে তিনি টানা তিনটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। একজন সৎ জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি শহরের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বা শত শত কোটি টাকার বড় বড় বাজেট অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন। বিশেষ করে ২০১১ সালের প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সারা দেশে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সব সময় নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বুধবার গভীর রাতে আইভী যখন নিজের বাসায় পা রাখেন, তখন নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এই আনন্দঘন মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাঈদ মাসুদ, প্রবীণ আইনজীবী জিয়াউল ইসলাম এবং শাহীন মাহমুদসহ আরও অনেক বিশিষ্ট নাগরিক। আইভীর ফিরে আসা তার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করেন, সব বাধা ও মানসিক চাপ পেরিয়ে তিনি আবারও সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিজের স্বাভাবিক জীবন শুরু করবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ