ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে বিজিবির বড় সাফল্য: বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও তাজা গুলি উদ্ধার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর সীমান্ত এলাকা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা এই সীমান্ত পথ ব্যবহার করে প্রায়ই চোরাকারবারিরা অবৈধ মালপত্র দেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের কড়া পাহারা এবং সতর্কতার কারণে তারা বারবার ব্যর্থ হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দেশের ভেতরে বড় কোনো নাশকতার উদ্দেশ্যে আনা একটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও বেশ কিছু তাজা গুলি উদ্ধার করেছেন বিজিবির টহল দলের সদস্যরা। তবে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই সফল অভিযান পরিচালনা করেন। বিজিবি সূত্র থেকে বিস্তারিত জানা যায়, তাদের কাছে আগে থেকেই অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য খবর ছিল যে সীমান্ত পথে অবৈধ অস্ত্রের একটি বড় চালান দেশে ঢুকবে। সেই নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজিবির একটি বিশেষ ও চৌকস টহল দল সীমান্তবর্তী এলাকায় খুব সতর্কতার সাথে নিজেদের অবস্থান নেয়। তারা কাঁটাতারের কাছাকাছি একটি নির্জন জায়গায় চারপাশ ঘিরে ওত পেতে বসে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তারা দেখতে পান, কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি ভারত সীমান্ত পার হয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। বিজিবির সদস্যরা তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে করে সাথে সাথে থামার নির্দেশ দেন।

বিজিবির এমন হঠাৎ উপস্থিতি টের পেয়ে এবং ধরা পড়ার ভয়ে চোরাকারবারিরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে সামনে এগোলে নিশ্চিত ধরা পড়তে হবে। তাই তারা নিজেদের সাথে থাকা একটি ভারী ব্যাগ মাটিতে ফেলে উল্টো দিকে দৌড় দেয় এবং দ্রুত সীমান্তের ওপারে ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর বিজিবি সদস্যরা সেই ফেলে যাওয়া ব্যাগটি উদ্ধার করে তল্লাশি করেন। ব্যাগ খুলতেই তারা সেখানে একটি চকচকে অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল দেখতে পান। এর সাথে তারা অস্ত্রের একাধিক ম্যাগাজিন এবং বেশ কয়েকটি তাজা গুলিও উদ্ধার করেন, যা দেশে বড় ধরনের কোনো অপরাধে ব্যবহারের জন্য আনা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কালোবাজারে এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডে এই ধরনের বিদেশি অস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অপরাধ জগতে এমন একটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল খুব সহজেই ১,৫০০থেকে২,০০০ডলার পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়। আমাদের দেশীয় টাকার হিসাবে যার দাম অনায়াসেই কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। মূলত বিশাল অঙ্কের এই লাভের আশায় চোরাকারবারিরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত দিয়ে এমন অবৈধ অস্ত্র দেশে নিয়ে আসে। স্থানীয় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ কিংবা পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অনেক সময় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য এসব অস্ত্র কিনে সমাজে এক চরম আতঙ্ক তৈরি করে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা সব সময় মনে করেন, দেশের ভেতরে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ বাড়লে সমাজে অপরাধের মাত্রা অন্তত ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। সন্ত্রাসীরা এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে খুন, ডাকাতি, জমি দখল ও চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক সব অপরাধ সংঘটিত করে। অনেক সময় আসন্ন কোনো স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এমন অস্ত্র মজুত করে। তাই মহেশপুর সীমান্তে বিজিবির এই অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ অভিযান নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। এই একটি অস্ত্র উদ্ধারের ফলে হয়তো সমাজের অনেক নিরীহ মানুষের জীবন বেঁচে গেল এবং বড় কোনো অপরাধের মাস্টারপ্ল্যান শুরুতেই ভেস্তে গেল।

মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, চোরাকারবারিরা অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে গেলেও উদ্ধার করা বিদেশি অস্ত্র ও গুলি তারা সম্পূর্ণ নিরাপদে নিজেদের হেফাজতে রেখেছেন। তারা খুব স্পষ্টভাবে জানান, সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি এখন ১০০% সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা রাতের বেলায় টহল ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করেছেন। অপরাধী চক্রগুলো যাতে কোনোভাবেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সীমান্ত এলাকায় বিজিবির কড়া নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

এই গুরুতর ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়াও বেশ দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিচ্ছে বিজিবি। উদ্ধার করা বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি মহেশপুর থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার কাজ চলছে। বিজিবির পক্ষ থেকে অবৈধ অস্ত্র বহন ও চোরাচালানের দায়ে অজ্ঞাত পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কর্মকর্তারা। পুলিশ এই মামলার তদন্তভার হাতে নিয়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে, ঠিক কার কাছে বা কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে এই অস্ত্রের চালানটি যাওয়ার কথা ছিল। এলাকার স্থানীয় সাধারণ মানুষ বিজিবির এই সাহসী ও সফল অভিযানের খবর শুনে অনেক স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, প্রশাসন এমন অভিযান নিয়মিত চালিয়ে গেলে সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি পুরো দেশ অপরাধীদের হাত থেকে নিরাপদ থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ