রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানা আমাদের সবার কাছে একটি অতি পরিচিত নাম। ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে এসেছি, চিড়িয়াখানা মানেই বাঘ, সিংহ, হাতি, বানর বা ময়ূরের মতো নানা প্রজাতির পশুপাখির এক বিশাল মিলনমেলা। ইট-পাথরের এই যান্ত্রিক শহরে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ একটু সবুজের খোঁজে এবং বন্য প্রাণীদের দেখতে ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে এখানে ভিড় জমান। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, এই চিড়িয়াখানার ভেতরে পশুপাখি দেখার পাশাপাশি আরেকটি দারুণ রোমাঞ্চকর কাজের সুযোগ রয়েছে। চিড়িয়াখানার ভেতরে থাকা দুটি বিশাল লেকে চাইলে আপনিও বড়শি ফেলে শান্ত পরিবেশে মাছ ধরতে পারেন। মাছ ধরার শখ যাঁদের আছে, তাঁদের জন্য এটি শহরের ভেতরেই এক চমৎকার বিনোদনের জায়গা।
জাতীয় চিড়িয়াখানার ভেতরের এই লেক দুটি মোটেও ছোট নয়। বিশাল আয়তনের এই জলাশয়গুলোর মধ্যে দক্ষিণ দিকের লেকটির আয়তন প্রায় ৩২ একর। অন্যদিকে উত্তর দিকের লেকটির আয়তনও বেশ বড়, প্রায় ২৪ একর। সরকারি মৎস্য অধিদপ্তর প্রতিবছর সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এই দুই লেকে প্রচুর মাছের পোনা ছাড়ে। লেকের পরিবেশ একদম প্রাকৃতিক হওয়ায় মাছগুলো ১০০% প্রাকৃতিক খাবার খেয়েই বড় হয়। এখানে কেউ বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য আলাদা কোনো কৃত্রিম খাবার দেয় না। কর্তৃপক্ষ সাধারণত এই লেকে জাল ফেলে মাছ ধরে না বলে মাছগুলো নির্বিঘ্নে অনেক বড় হওয়ার সুযোগ পায়।
মাচশিকারিদের জন্য কর্তৃপক্ষ একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালু রেখেছে। প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম শুক্রবার সকাল সাতটা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বড়শি দিয়ে মাছ ধরার এই বিশেষ সুযোগ মেলে। সেদিন যে কেউ নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বড়শি নিয়ে লেকের পাড়ে বসে যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ মাছ ধরার একটি টিকিটের দাম নির্ধারণ করেছে ২,০০০ টাকা, যা বর্তমান বৈশ্বিক মুদ্রার হিসাবে প্রায় ১৭$ (ডলার) এর সমান। এই দুই হাজার টাকার একটি টিকিট দিয়ে একজন শিকারি একসঙ্গে দুটি বড়শি পানিতে ফেলার সুযোগ পান। চিড়িয়াখানার এই নিয়মের কারণে শহরের অনেক সৌখিন মাছশিকারি মাসের এই দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।
আপনি শুনলে অবাক হবেন যে, এই লেক দুটিতে রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, পাঙাশ, গজার ও তেলাপিয়াসহ দেশীয় প্রায় সব সুস্বাদু জাতের মাছ প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জাল না ফেলার কারণে এখানকার মাছগুলো আকারে বিশাল হয়ে ওঠে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, সৌভাগ্যবান শিকারিরা বড়শিতে কখনো কখনো ২৫ থেকে ৩০ কেজি ওজনের দানবাকৃতির মাছও গেঁথে ফেলেন। তবে ১৫ থেকে ২০ কেজি ওজনের মাছ বড়শিতে আটকা পড়াটা এখানে বেশ সাধারণ ঘটনা। এত বড় মাছ ধরার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতেই শিকারিরা ভোরবেলা ছুটে আসেন।
জাতীয় চিড়িয়াখানার বর্তমান পরিচালক মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার মাছ ধরার এই পুরো প্রক্রিয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার একেবারে ভোরবেলা চিড়িয়াখানার মূল ফটকে তাঁদের কর্মীরা উপস্থিত থাকেন। কোনো ব্যক্তি ফটকে এসে মাছ ধরার আগ্রহ প্রকাশ করলে চিড়িয়াখানার কর্মীরা তাঁকে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে টিকিট বিক্রি করেন। যাঁরা সত্যিকারের মাছশিকারি, তাঁরা সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যেই নিজেদের জায়গা দখল করতে চলে আসেন। চিড়িয়াখানার কর্মীরা সকাল আটটা পর্যন্ত ফটকে টিকিট নিয়ে বসেন। এরপর কেউ দেরি করে এলে গেটে যোগাযোগ করে টিকিটের ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। টিকিট বিক্রির এই টাকা চিড়িয়াখানার নিজস্ব আয়ের একটি দারুণ উৎস হিসেবে কাজ করে।
রফিকুল ইসলাম আরও জানান, একেক মাসে একেক রকম মানুষের সমাগম ঘটে। কোনো কোনো মাসে হয়তো ৭০ থেকে ৭৫ জন শিকারি এই লেকে বড়শি ফেলেন। তবে গড়ে প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার অন্তত ৪৫ থেকে ৫০ জন মানুষ নিয়মিত মাছ ধরতে আসেন। এখানে মাছ পাওয়াটা পুরোপুরি ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ সারা দিন বসে থেকে একটি মাছও ধরতে পারেন না। আবার কেউ হয়তো ভাগ্যগুণে বিশাল আকারের কয়েকটি মাছ ধরে ফেলেন। তখন সেই শিকারির আনন্দের আর কোনো সীমা থাকে না। শিকারিরা নিজেদের ধরা মাছ সানন্দে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন।
চিড়িয়াখানা ও এই লেকের ইতিহাস বেশ পুরোনো। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ১৮৬ দশমিক ৬৩ একর জায়গার ওপর বর্তমান চিড়িয়াখানাটি দাঁড়িয়ে আছে। পঞ্চাশের দশকে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে খুব ছোট পরিসরে হরিণ, হাতি ও বানর নিয়ে প্রথম চিড়িয়াখানার যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৬০ সালে মিরপুরে এটি স্থানান্তরের মহাপরিকল্পনা পাস করে সরকার। সব কাজ শেষে ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন সাধারণ মানুষের জন্য মিরপুরের চিড়িয়াখানাটি উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। চিড়িয়াখানার কিউরেটর মো. আতিকুর রহমান জানান, ১৯৭৮ সালে এই দুটি লেক খননের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৮০ সালে তা শেষ হয়। খননের পরপরই সেখানে মৎস্য অধিদপ্তর প্রচুর মাছ ছাড়ে।
শুরুতে বছরে একবার এই লেকের মাছ ধরত কর্তৃপক্ষ। এরপর ১৯৯০ সালে তারা প্রথম বড়শি দিয়ে মাছ ধরার নিয়ম চালু করে। তখন মাসে চারবার বড়শি ফেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত মানুষের কারণে বন্য প্রাণীদের শান্তি নষ্ট হচ্ছিল এবং শব্দদূষণ প্রায় ৫০% বেড়ে গিয়েছিল। প্রাণীদের কথা বিবেচনা করে পরে মাসে মাত্র একবার বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। আতিকুর রহমান জানান, সর্বশেষ ২০২২ সালে তাঁরা জাল দিয়ে এই লেকে মাছ ধরেছিলেন এবং সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছিলেন। বড় মাছ ছোট মাছ খেয়ে ফেলে বলে ভারসাম্য রক্ষার্থে ভবিষ্যতে হয়তো আবারও জাল দিয়ে মাছ ধরার উদ্যোগ নেবে কর্তৃপক্ষ। তবে সে জন্য তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।














