কুমিল্লায় উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে তুমুল বিতর্ক: পকেটে নয়, টাকা গেছে উপজেলার তহবিলে, জবাব হাসনাতের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজনীতিতে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এবার কুমিল্লার রাজনীতিতে সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা নিয়ে বেশ বড় ধরনের এক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দুই শীর্ষ নেতা বিশাল অঙ্কের টাকা নিজেদের পকেটে ভরেছেন। এই গুরুতর অভিযোগের পরপরই মাঠে নেমেছেন কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য এবং এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাব দিয়েছেন এবং পুরো বিষয়টি সাধারণ মানুষের সামনে পরিষ্কার করে তুলে ধরেছেন।

গত শনিবার দুপুরে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে একটি বড় আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। মূলত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে স্থানীয় বিএনপি এই সভার আয়োজন করে। সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বিস্ফোরক এক দাবি করেন। তিনি বলেন, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে ১৫ কোটি টাকা নিয়েছেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার ($১.২৫ মিলিয়ন)। পাশাপাশি তিনি এও দাবি করেন যে, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ নিয়েছেন আরও ১০ কোটি টাকা।

এত বড় অভিযোগ শোনার পর চুপ করে বসে থাকেননি তরুণ সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে পুরো বিষয়টির বিস্তারিত ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। হাসনাত একেবারে পরিষ্কার করে বলেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক যে বিপুল পরিমাণ টাকার কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি মূলত উপজেলার সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য দেওয়া সরকারি বাজেট বরাদ্দ। এই টাকা কোনোভাবেই তাকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারি বাজেট কোনো নেতার পকেটে যায় না, বরং এর ১০০% টাকা সরাসরি উপজেলার নির্দিষ্ট ব্যাংক তহবিলে জমা হয়। সেখান থেকে নিয়ম মেনে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করা হয়।

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও জানান, দেবীদ্বার উপজেলাকে ঠিক কোন কোন খাতে এবং কোন কোন উন্নয়ন কাজের জন্য এই টাকা দেওয়া হয়েছে, তার পুরো তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে খুব সুরক্ষিতভাবে জমা আছে। উপজেলা পরিষদ এই টাকা কোথায় কীভাবে খরচ করেছে, তার প্রতিটি পয়সার হিসাবও তাদের কাছে রয়েছে। প্রশাসক চাইলে খুব সহজেই সেই হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারেন। বর্তমান সময়ে দেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯% এর কাছাকাছি, এই সময়ে এলাকার রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নের টাকা নিয়ে রাজনীতি করাকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করেন।

নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, দেবীদ্বার উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য তাকে যদি কোথাও গিয়ে ভিক্ষাও চাইতে হয়, তাতে তার বিন্দুমাত্র কোনো আপত্তি নেই। কারণ তিনি যা কিছুই করছেন, তার ১% কাজও নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে করছেন না। তিনি যা চাইছেন, তা শুধুই তার এলাকার খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য। এলাকার মানুষ তাকে ভোট দিয়ে নেতা বানিয়েছেন, তাই তাদের সুবিধা দেখা তার প্রধান দায়িত্ব।

বরাদ্দের ধরন নিয়ে তৈরি হওয়া বড় ধরনের বিভ্রান্তিও দূর করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই বরাদ্দ স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেওয়া একটি বিশেষ ধরনের বরাদ্দ, যা জেলা পরিষদের মাধ্যমে এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় দেওয়া হয়েছে। হাসনাত জানান, দেবীদ্বার উপজেলাকে মূলত ৫ কোটি টাকা বা প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার ডলার ($৪১৫,০০০) দেওয়া হয়েছে। জেলা পরিষদ প্রশাসক দাবি করেছেন, এই টাকা রাজস্ব খাত থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু হাসনাত এর কড়া প্রতিবাদ করে বলেন, এই উন্নয়ন অর্থের সঙ্গে জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। এটি পুরোপুরি এডিপি খাতের টাকা।

জেলা পরিষদ প্রশাসকের কথা বলার ধরন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, মোস্তাক মিয়া এমনভাবে কথাগুলো সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন, যেন আমরা নেতারা পুরো টাকা নিজেদের পকেটে ভরে বাড়ি নিয়ে গেছি। অথচ সত্য হলো, দেবীদ্বারের বিভিন্ন ভাঙা রাস্তার কাজ, স্কুল সংস্কার এবং অন্যান্য জরুরি কাজেই এই সম্পূর্ণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে এমন কাদা ছোঁড়াছুড়ির কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতিটি কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। রাজনীতিবিদদের উচিত ব্যক্তিগত আক্রমণ বাদ দিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের দিকে মন দেওয়া। সাধারণ মানুষ চায় তাদের ট্যাক্সের টাকায় বরাদ্দ হওয়া প্রতিটি প্রকল্প যেন শতভাগ সফল হয় এবং দুর্নীতিমুক্ত থাকে। হাসনাত আবদুল্লাহর এই স্পষ্ট জবাব কুমিল্লার সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হওয়া অনেক বিভ্রান্তি দূর করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ