ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় স্থানীয় রাজনীতি ও গ্রাম্য আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের শেখরা গ্রামে এই মারামারির ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই একটি শান্ত গ্রাম পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্থানীয় দলাদলি ও ক্ষমতার লড়াই মূলত এই সংঘর্ষের প্রধান কারণ বলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত এবং পেছনের গল্পটি বেশ হতাশার। জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খলিল ফকির, যুগ্ম সম্পাদক দিয়ানত বিশ্বাস এবং ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব এস এম সিদ্দিক একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এলাকার দীর্ঘদিনের বিরোধ মিটিয়ে একটি সুন্দর শান্তি চুক্তি করা। এই মহৎ উদ্দেশ্যে তারা শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন বাবর ফিরোজের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তারা কল্পনাও করতে পারেননি যে, শান্তির পথে পা বাড়িয়ে তাদের এমন ভয়াবহ হামলার শিকার হতে হবে।
তারা তিনজন যখন গ্রামের স্থানীয় বাজারের কাছাকাছি পৌঁছান, ঠিক তখনই শেখরা গ্রামের মোস্তফা সরকারের লোকজন তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাঠিসোঁটা, লোহার রড ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সময় হামলাকারীরা চরম আক্রোশে দিয়ানত বিশ্বাসের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নির্মমভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে ভাঙচুর করে। বর্তমান বাজারে এমন একটি মোটরসাইকেলের দাম প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মতো। চোখের সামনে নেতাদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা ও সম্পত্তি নষ্ট হতে দেখে তাদের সমর্থকরাও প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
মুহূর্তের মধ্যেই নেতাদের ওপর হামলার এই খবর পুরো শেখরা গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই শুরু হয় আসল সংঘর্ষ। শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্য পুরোপুরি ভেস্তে যায়। উভয় পক্ষের লোকজন যার যা হাতের কাছে ছিল, তা-ই নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চলা এই ভয়াবহ মারামারিতে পুরো এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নারী ও শিশুরা ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করেন। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। কিন্তু আহতদের মধ্যে শহীদ ও শাহিনুর নামের দুই ব্যক্তির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে চাননি। তারা দ্রুত ওই দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে রেফার করেন। গ্রামগঞ্জে এমন সংঘর্ষের কারণে গরিব মানুষদের চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় আহতদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে একটি সাধারণ কৃষক পরিবারক ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ধারদেনা করতে হয়, যা তাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেয়।
হামলার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খলিল ফকির ও যুবদল নেতা এস এম সিদ্দিক সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরেন। তারা বলেন, আমরা শুধু এলাকার মানুষের শান্তির কথা ভেবে উপজেলা নেতার কাছে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মোস্তফা সরকারের লোকজন বিনা উসকানিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমাদের ওপর হামলা করেছে। তারা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ১০০% ধরে রাখতে চায় বলেই এমন জঘন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এই ন্যাক্কারজনক হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার চাই।
আমাদের সমাজে এমন আধিপত্য বিস্তারের লড়াই নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সামাজিক গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা মারামারির প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই থাকে এই স্থানীয় ক্ষমতা দখলের নোংরা চেষ্টা। এসব সংঘর্ষের কারণে গ্রামের দিনমজুর ও সাধারণ কৃষকরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন। বাজারঘাট বন্ধ থাকায় তাদের দৈনন্দিন রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা ভয়ে স্কুলে যেতে পারে না। শেখরা গ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি এখন বেশ থমথমে। আবারও নতুন করে হামলা হতে পারে, এই ভয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ আজ সকাল থেকে বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
খবর পেয়ে শৈলকুপা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকায় যাতে নতুন করে আর কোনো সংঘাত বা প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে, সে জন্য পুলিশ সেখানে কঠোর টহল জোরদার করেছে। সাধারণ মানুষ চাইছেন, প্রশাসন যেন প্রকৃত দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে এলাকায় স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনে। তা না হলে গ্রামের এই সংঘাত আগামী দিনে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে এবং শান্তির বদলে সমাজ আরও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।














