কাউকে না জানিয়ে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঢাকার বর্জ্য পরিস্থিতি দেখলেন প্রধানমন্ত্রী, দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

কাউকে আগে থেকে কিছু না জানিয়ে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম দেখতে শুক্রবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পরিদর্শনের সময় তিনি ভিআইপি প্রটোকলের কোনো চালক বা নিরাপত্তারক্ষীর বহর নেননি, বরং নিজেই নিজের গাড়ি চালিয়েছেন। শুক্রবার বেলা দুইটা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টানা প্রায় চার ঘণ্টা তিনি রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তাঘাট ঘুরে দেখেন। ঈদের পর শহর ১০০% পরিষ্কার রাখার যে প্রতিশ্রুতি সিটি করপোরেশন সাধারণ মানুষকে দেয়, তার বাস্তব চিত্র নিজের চোখে দেখতেই তিনি এই ব্যতিক্রমী ঝটিকা পরিদর্শনে বের হন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই আকস্মিক পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন মৃধা এবং প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মেহেদুল ইসলাম ছিলেন। তবে তারা কেউই আগে থেকে এই গোপন সফরের বিষয়ে বিন্দুবিসর্গ জানতেন না। সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা ফাঁকা না করে একদম সাধারণ মানুষের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে প্রধানমন্ত্রী পুরো শহর ঘুরে দেখেছেন।

পুরো ঘটনার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে তাকে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালামকে তার বাসার সামনে জরুরি ভিত্তিতে ডাকেন। সেখানে তারা পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে নিজেদের সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন। এরপর তিনি সবাইকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন এবং নিজেই স্টিয়ারিং ধরেন। মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী কেন হঠাৎ তাদের ডেকেছেন এবং কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।

গাড়ি চলতে শুরু করার পর তারা বুঝতে পারেন যে প্রধানমন্ত্রী আসলে ঢাকায় চলমান বিভিন্ন উন্নয়নকাজ এবং কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে দেখতে বের হয়েছেন। প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় বর্জ্য অপসারণের জন্য সিটি করপোরেশনগুলো বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে। ব্লিচিং পাউডার, জীবাণুনাশক স্প্রে, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ভ্যান বা ট্রাক ভাড়া বাবদ অনেক সময় প্রায় ১.৫ মিলিয়ন $ (ডলার) থেকে শুরু করে ২ মিলিয়ন $ পর্যন্ত বিপুল অর্থ ব্যয় করে এই সেবা সংস্থাগুলো। এত বিশাল আয়োজনের পরও তারা যখন শহরের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছান, তখন সেখানকার দৃশ্য দেখে প্রধানমন্ত্রী চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি চালিয়ে হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিনরোড, ফার্মগেট এবং কারওয়ান বাজার এলাকা পার হন। এই এলাকাগুলোর রাস্তায় তিনি কোরবানির পশুর নতুন বর্জ্যের পাশাপাশি আগে থেকে জমে থাকা পুরোনো ময়লাও যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখেন। দুর্গন্ধ এবং ময়লার কারণে পথচারীদের হাঁটাচলা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কোটি কোটি টাকা খরচ করার পরও শহরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক রাস্তাগুলোতে এমন নোংরা পরিবেশ দেখে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। অন্তত ৯০% থেকে ৯৫% বর্জ্য যেখানে প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুরোপুরি পরিষ্কার করার কথা, সেখানে খোদ রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোর এমন বেহাল দশা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।

নিজের চোখে এমন অব্যবস্থাপনা দেখার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিক এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানান, এসব এলাকায় বর্জ্য অপসারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চরম অবহেলার বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। তার সরাসরি নির্দেশে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাথে সাথে তাদের পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারে এমন চরম অবহেলার জন্য তাদের দুজনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া নির্দেশ দেন তিনি।

দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাৎক্ষণিক শাস্তি পাওয়া এই দুই কর্মকর্তা হলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজির। তারা দুজনই সরকারের উপসচিব পদমর্যাদার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রী নিজের কাজের মাধ্যমে সবাইকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, পদ যত বড়ই হোক না কেন, জনগণের কাজে ফাঁকি দিলে কাউকেই আর বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।

স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কোরবানির পশুর বর্জ্য যাতে দ্রুত এবং সুষ্ঠুভাবে অপসারণ করা হয়, সে জন্য ঈদের আগেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। নগরবাসীকে ডেঙ্গু মশা এবং বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের হাত থেকে বাঁচাতে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান খুব জরুরি ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনে প্রমাণ হলো যে, মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনার চরম ঘাটতি রয়েছে। কোনো প্রটোকল ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর এই ঝটিকা সফর এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সিটি করপোরেশনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মাঝেও এখন কাজের প্রতি নতুন করে সতর্কতা এবং ভয় তৈরি হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ