সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপানো ‘সুন্দরী’র দিদি সায়নীর হঠাৎ মৃত্যু, কাঁদছে লাখো অনুসারী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

হাসিখুশি মুখ আর পোষা গরু ‘সুন্দরী’কে নিয়ে করা মিষ্টি সব ভিডিও দিয়ে লাখো মানুষের মন জয় করেছিলেন তিনি। বলছি জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ভ্লগার সায়নী চক্রবর্তীর কথা। ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে ঢুকলেই যার সহজ-সরল জীবনের গল্প দেখতে পেতেন নেটিজেনরা, সেই প্রাণবন্ত সায়নী আর বেঁচে নেই। হঠাৎ করেই তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে নেটদুনিয়ায় রীতিমতো শোকের ছায়া নেমে আসে। নিজেদের প্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে এভাবে অকালে হারিয়ে ভক্তরা যেন কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছেন না।

পুলিশ সায়নীর নিজের ঘর থেকেই তার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের লোকজন তাকে দ্রুত চুঁচুড়া ইমামপাড়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই হাসপাতালেই তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এই তরুণী নিজেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে জীবন শেষ করে দিয়েছেন। তবে ঠিক কী এমন কষ্ট ছিল যার কারণে তিনি এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো সুইসাইড নোট পাননি। তবে পুলিশ জানতে পেরেছে, বেশ কিছুদিন ধরে তিনি গভীর মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। পাশাপাশি এক তরুণের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কের চরম টানাপোড়েন চলছিল। পুলিশ এই প্রেমের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখছে।

সায়নীর জনপ্রিয়তার মূল কারণ ছিল তার ভিডিওর একদম ঘরোয়া ও সাধারণ উপস্থাপন। কোনো ধরনের অতিরিক্ত সাজানো বা নাটকীয়তা ছাড়াই তিনি নিজের দৈনন্দিন জীবন, পোষ্যদের আদর-যত্ন আর পরিবারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় বন্দী করতেন। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আয় করা অনেক তরুণ-তরুণীরই প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন স্পনসরশিপ ও ভিউ থেকে একজন জনপ্রিয় ভ্লগার অনায়াসেই মাসে ৫০০

থেকে১,০০০থেকে১,০০০

 ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারেন। সায়নীর অনুসারী সংখ্যাও ৩ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ভিডিওগুলোতে তার অন্তত ৯০% দর্শক ইতিবাচক মন্তব্য করতেন। বিশেষ করে ‘সুন্দরী’ নামের পোষ্য গরুটিকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে তৈরি করা ভিডিওগুলো তুমুল ভাইরাল হতো। মানুষ অবাক হয়ে দেখত একটি পশুর সঙ্গে মানুষের কতটা গভীর ভালোবাসা থাকতে পারে।

সায়নীর এই ভ্লগিং যাত্রায় সবসময় তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে পাশে ছিলেন মা মলি চক্রবর্তী। সোশ্যাল মিডিয়ায় মায়েরও আলাদা একটি পরিচিতি রয়েছে। মা-মেয়ে দুজনে মিলে প্রায়ই একসঙ্গে মজার সব ভিডিও বানাতেন। তাদের পেজে চোখ রাখলেই বাড়ির আঙিনায় পোষ্যদের দেখাশোনা আর খুনসুটির মিষ্টি মুহূর্তগুলো ফুটে উঠত। এমনকি গত বৃহস্পতিবার সকালেও মলি চক্রবর্তী নিজের পেজ থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে তাদের সেই আদরের পোষ্যদের দেখা যায়। কে জানত, এর কয়েক ঘণ্টা পরই এমন একটা চরম দুঃসংবাদ এসে পুরো পরিবারকে তছনছ করে দেবে! হুগলি গ্রামীণ পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি, তবে তারা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন বলে পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে।

শুধু ভিডিও বানানোতেই সায়নী আটকে ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন। সম্প্রতি তিনি সাফল্যের সঙ্গে এলএলবি ডিগ্রিও শেষ করেন। কিছুদিন আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সমাবর্তনের আনন্দের ছবি ও ভিডিও ভক্তদের সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন তিনি। পড়াশোনা আর কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি তার আরেক বড় শখ ছিল বাইক চালানো। শাড়ি হোক বা জিনস, যেকোনো পোশাকেই বাইক নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানোর ভিডিওগুলো ভক্তরা বেশ লুফে নিতেন। মেয়েদের বাইক চালানো নিয়ে সমাজে যে জড়তা আছে, সায়নী নিজের ভিডিওর মাধ্যমে বারবার সেই শেকল ভাঙার বার্তা দিতেন।

এর বাইরে তিনি মাঝেমধ্যে ব্রাইডাল বা বউ সাজের মডেল হিসেবেও কাজ করতেন। কনের সাজে তার বেশ কিছু দারুণ ছবি ও রিল ইনস্টাগ্রামে রয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, মৃত্যুর আগে ইনস্টাগ্রামে সায়নী যে শেষ রিলটি পোস্ট করেছিলেন, সেখানেও তিনি ভারী গয়না আর শাড়িতে কনের সাজেই ছিলেন। একটি পুরোনো বিষণ্ণ বাংলা গানের সঙ্গে তিনি লিপ মিলিয়েছিলেন ওই ভিডিওতে। এখন সেই ভিডিও ঘিরেই নেটিজেনরা নানা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করছেন। অনেকেই মনে করছেন, হয়তো ওই গানের কথার মাঝেই তার না বলা কোনো কষ্ট লুকিয়ে ছিল।

৩ লাখের বেশি অনুসারীর কাছে সায়নী শুধু একজন ভ্লগার ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাদের প্রতিদিনের আনন্দের খোরাক। অনেকেই বলতেন, সায়নীর ভিডিও দেখলে নিমেষেই মন ভালো হয়ে যায়। তাই তার এমন অকাল বিদায়ে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না। এক ভক্ত দীর্ঘ স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ভিডিও দেখে কখনো বুঝিনি মেয়েটা ভেতরে ভেতরে এতটা যুদ্ধ করছিল। আসলেই, সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ার আড়ালে মানুষের জীবনের আসল কষ্টগুলো হয়তো এভাবেই সবার চোখের আড়ালে থেকে যায়। একজন হাসিখুশি মানুষের এমন পরিণতি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানসিক অবসাদ কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ