টানা ৬০ দিন জামাতে নামাজ আদায়: কোটচাঁদপুরে বাইসাইকেলসহ পুরস্কার জিতলেন ১৩ যুবক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্ম যখন স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর আড্ডায় নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে, ঠিক তখনই ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে ঘটল এক দারুণ ঘটনা। তরুণদের ভালো পথে ফেরাতে এবং ধর্মীয় অনুশাসনে আগ্রহী করতে একটি চমৎকার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে স্থানীয় একটি সংগঠন। নিয়ম ছিল একটানা ৬০ দিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে এসে জামাতের সাথে আদায় করতে হবে। দীর্ঘ এই দুই মাসের পবিত্র লড়াই শেষে সফল হয়েছেন গ্রামের ১৩ জন যুবক। এই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দিয়েছেন আয়োজকরা।

এই সুন্দর ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি গ্রহণ করে কোটচাঁদপুর উপজেলার হরিন্দিয়া গ্রামের ‘মাদ্রাসা পড়া যুব উন্নয়ন সংঘ’। আজ থেকে ঠিক দুই মাস আগে তারা গ্রামের তরুণ ও যুবকদের জন্য এই প্রতিযোগিতার ঘোষণা দেয়। নিয়মটি শুনতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি পালন করা ছিল বেশ কঠিন। কারণ, টানা ৬০ দিন শীত বা গরম উপেক্ষা করে ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজে যাওয়া কিংবা বিকেলে বন্ধুদের আড্ডা ছেড়ে আসর ও মাগরিবের জামাতে শরিক হওয়া তরুণদের জন্য অনেক বড় একটি পরীক্ষা। কিন্তু হরিন্দিয়া গ্রামের যুবকরা সেই কঠিন পরীক্ষায় ১০০% সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

আয়োজকদের এই ঘোষণার পর পুরো গ্রাম জুড়ে এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে মসজিদে যাওয়ার এক অদৃশ্য ও সুন্দর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সাধারণত আমাদের দেশের গ্রাম বা শহরের মসজিদগুলোতে ফজর বা এশার সময় মাত্র ২০% থেকে ৩০% মুসল্লির উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু এই ঘোষণার পর হরিন্দিয়া গ্রামের মসজিদের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। প্রতিটি ওয়াক্তেই প্রথম কাতারে গ্রামের তরুণদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দীর্ঘ দুই মাস ধরে স্থানীয় যুবসমাজ ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করতে থাকে।

কঠিন এই সাধনা শেষে গতকাল শুক্রবার, ২৯ মে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। হরিন্দিয়া মাদ্রাসা মাঠে এক আড়ম্বরপূর্ণ ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আয়োজক ও অতিথিরা। প্রতিযোগিতায় সফল ১৩ জন যুবকের মধ্যে লটারির মাধ্যমে বা সবচেয়ে বেশি নিয়মিত থাকা সেরা ৩ জনকে দেওয়া হয় ঝকঝকে নতুন বাইসাইকেল। এই তিন ভাগ্যবান যুবক হলেন আলিফ, আব্দুল্লাহ এবং আমির হামজা। বাকি ১০ জন যুবক যারা সফলভাবে ৬০ দিন পূর্ণ করেছেন, তাদের প্রত্যেককে উন্নত মানের বিভিন্ন ইসলামী বই উপহার দেওয়া হয়। পুরস্কার পেয়ে যুবকদের চোখেমুখে যে আনন্দের আভা দেখা গেছে, তা ছিল সত্যিই দেখার মতো।

আয়োজকরা জানান, যুবকদের উৎসাহিত করতে তারা গ্রামের মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে এই পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমান বাজারে ৩টি ভালো মানের বাইসাইকেল ও ১০টি উন্নত মানের বই কিনতে তাদের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। টাকার অঙ্কে এটি খুব বিশাল কিছু না হলেও, এর সামাজিক মূল্য অনেক বেশি। মাত্র ৩০০$ খরচ করে গ্রামের তরুণদের অন্তত ৭০% খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার এই কৌশল এখন আশপাশের অন্য গ্রামের মানুষদেরও ভাবাচ্ছে। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের এমন পরিবর্তনে ভীষণ খুশি।

শুক্রবার বিকেলের এই চমৎকার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় আলেম মাওলানা আতিকুর রহমান। পুরো অনুষ্ঠানটি খুব সাবলীলভাবে পরিচালনা করেন মাসুম বিল্লাহ। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আল মামুন বাবু, দেলোয়ার হোসেন সাইদী, আ. মালেক, আ. মজিদ মিয়া, সোহাগ আহমেদ ও হাবিবুর রহমান। এছাড়াও সবুজ হোসেন, আবুল কালাম, হারুনসহ এলাকার নানা বয়সের ও নানা পেশার মানুষ এই আনন্দঘন মুহূর্তে শরিক হতে মাদ্রাসা মাঠে ভিড় জমান। তারা হাততালি দিয়ে বিজয়ীদের উৎসাহ জোগান।

উপস্থিত অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণরা খুব সহজেই মাদক এবং ইন্টারনেটের খারাপ দুনিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এমন একটি কঠিন পরিস্থিতিতে নামাজ এবং ধর্মীয় অনুশাসন তাদের সঠিক পথে রাখতে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে। হরিন্দিয়া গ্রামের ‘মাদ্রাসা পড়া যুব উন্নয়ন সংঘ’ যে কাজটি করেছে, তা সারা দেশের প্রতিটি গ্রামের জন্য একটি বড় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আরও বলেন, তরুণরা সাইকেল চালিয়ে যখন গ্রামে ঘুরবে, তখন অন্য শিশু-কিশোররাও তাদের দেখে নামাজ পড়তে উৎসাহিত হবে।

স্থানীয় বয়স্ক মানুষেরা আশা করেন, আগামী দিনে এমন আয়োজনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে। এই ১৩ জন যুবক এখন গ্রামের অন্য তরুণদের জন্য রোল মডেল। এমন ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমেই আমাদের সমাজ থেকে ধীরে ধীরে অপরাধ কমে আসবে এবং গ্রামগুলো এক একটি আদর্শ গ্রামে পরিণত হবে। এই প্রতিযোগিতার রেশ ধরে গ্রামের যুবকরা আগামীতেও নিয়মিত মসজিদে যাবেন বলে আয়োজকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ