শৈলকুপায় নতুন সামাজিক সংগঠন ‘আগামীর শৈলকুপা’র আত্মপ্রকাশ ও উন্নয়ন ভাবনা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও উন্নত জনপদ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে নতুন একটি সামাজিক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে। সংগঠনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আগামীর শৈলকুপা’। এই শুভ আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে উপজেলা পরিষদ মিলরঅয়তনে ‘আগামীর শৈলকুপার উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক এক দীর্ঘ ও প্রাণবন্ত আলোচনা সভার আয়োজন করেন উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মীরা। শুক্রবার উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে এই অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এই আয়োজনে অংশ নেন। সবার চোখেমুখেই ছিল নিজেদের জন্মস্থানকে সুন্দর করে সাজানোর এক নতুন আশা ও উদ্দীপনা। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তারা এলাকায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চান।

এই সুন্দর ও গোছানো আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠান আলো করে ছিলেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। এছাড়াও স্থানীয় গণ্যমান্য মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সাংবাদিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও অন্য সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস এই ‘আগামীর শৈলকুপা’ সংগঠনের সভাপতি হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। তবে আজকের এই বিশেষ আলোচনা সভায় সভাপতিত্বের আসন অলংকৃত করেন আরেক সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস। তাদের মতো প্রবীণ, ত্যাগী ও অভিজ্ঞ মানুষদের সরাসরি দিকনির্দেশনা নতুন এই সংগঠনটিকে অনেক দূর নিয়ে যাবে বলে সবাই গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা শৈলকুপার অতীত ঐতিহ্য, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তারা জানান, শুধু সরকারের বা জনপ্রতিনিধিদের আশায় বসে থাকলে একটি এলাকার পুরোপুরি উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, কৃষি খাত ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হলে সমাজের সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের দেশের অর্থনীতি এখনো মূলত কৃষির ওপরই শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শৈলকুপার প্রায় ৭৫% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সাথে জড়িত। তাই কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদের সুবিধা দেওয়া এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার বিষয়ে বক্তারা বারবার জোর দেন। তারা বলেন, কৃষির সত্যিকার উন্নয়ন হলে গ্রামের সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থাও অনেক বেশি মজবুত হবে।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগের জায়গা ছিল তরুণ সমাজকে নিয়ে আলোচনা। বর্তমানে গ্রামের যুবকদের মধ্যে খুব সহজেই মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধ ঢুকে পড়ছে। বক্তারা অত্যন্ত চিন্তার সাথে বলেন, এলাকার অন্তত ৪০% থেকে ৫০% তরুণ যদি এমন খারাপ পথে পা বাড়ায়, তবে শৈলকুপার ভবিষ্যৎ একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই তরুণ সমাজকে যেকোনো মূল্যে সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রাখতে হবে। তাদের বেশি করে মাঠে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। তরুণরা যদি বিপথগামী না হয়ে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে, তবে তারা খুব সহজেই নিজেদের বেকারত্ব দূর করে পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে পারবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান এমপি উপস্থিত সবার উদ্দেশে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দারুণ কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, একটি এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নে সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা আসলেই অনেক বড়। তারা যদি সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে, তবে সমাজে খুব দ্রুত একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তিনি আরও বলেন, সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি প্রবাসী ও সমাজের বিত্তবানদেরও এলাকার মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। বিদেশে থাকা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যদি এলাকার স্কুল, মাদ্রাসা বা হাসপাতালে অনুদান পাঠান, তা দিয়ে এলাকার অনেক গরিব মানুষের বড় ধরনের উপকার করা সম্ভব। তিনি তরুণ প্রজন্মকে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, সৎ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জোরালো আহ্বান জানান।

সংগঠনের উদ্যোক্তারা অনুষ্ঠানে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা সবার সামনে তুলে ধরেন। তারা খুব স্পষ্টভাবে জানান, ‘আগামীর শৈলকুপা’ শুধু সাইনবোর্ড বা নামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তারা গ্রামের গরিব, এতিম ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার খরচ দিয়ে সাহায্য করতে চান। এছাড়া পরিবেশ বাঁচাতে এলাকায় প্রতি বছর প্রচুর গাছ লাগানো, সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা এবং শীতে অসহায় মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের মতো মানবিক কাজগুলো তারা নিয়মিত চালিয়ে যাবেন। সমাজের অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে সব সময় ছায়ার মতো পাশে থাকাই এই নতুন সংগঠনের মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে সেখানে এক আবেগঘন ও চমৎকার পরিবেশ তৈরি হয়। সভায় উপস্থিত সবাই শৈলকুপার সার্বিক উন্নয়নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন। তারা একবাক্যে বলেন, নিজেদের মধ্যে থাকা ছোটখাটো রাগ, অভিমান ও ভেদাভেদ ভুলে বৃহত্তর এলাকার স্বার্থে আমাদের আজ এক হতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সবাই যদি মন থেকে এলাকার ভালো চায়, তবে শৈলকুপা খুব দ্রুত একটি আধুনিক, শিক্ষাবান্ধব ও মডেল উপজেলা হিসেবে সারা দেশের কাছে পরিচিতি পাবে। চমৎকার এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শৈলকুপার সাধারণ মানুষ একটি সুন্দর ও নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ