রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু: কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত শুরু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সন্তান জন্মের পর একটি পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু সেই আনন্দ যদি মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চরম বিষাদে রূপ নেয়, তবে বাবা-মায়ের কষ্টের কোনো সীমা থাকে না। ঠিক এমন এক হৃদয়বিদারক ও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর মগবাজারের পরিচিত চিকিৎসাকেন্দ্র আদ্-দ্বীন হাসপাতালে। চিকিৎসার অবহেলায় সেখানে ছয়জন ফুটফুটে নবজাতক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় মৃত এক শিশুর বাবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনাকে সরাসরি দায়ী করে পুলিশের কাছে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

গতকাল বুধবার রাতে রমনা থানায় নিজে উপস্থিত হয়ে এই অভিযোগ দায়ের করেন হাবিবুর রহমান নামের শোকাহত এক বাবা। তিনি তার লিখিত অভিযোগে জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই তার সন্তানসহ আরও কয়েকটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছে। রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, হাবিবুর রহমান তার এজাহারে কোনো নির্দিষ্ট ডাক্তার বা নার্সের নাম উল্লেখ করেননি। পুরো আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই এই মামলার প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে ঘটনার মূল কারণ খুঁজতে মাঠে নেমেছে। তবে তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।

মৃত শিশুগুলোর বয়স ছিল মাত্র এক থেকে তিন দিনের মধ্যে। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তাদের এভাবে বিদায় নিতে হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়ে সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা দেন। তারা জানান, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে ডেলিভারির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা বাচ্চারা হঠাৎ করেই প্রচণ্ড কান্নাকাটি শুরু করে। অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানে ওয়ার্ডের সব কটি শিশু একযোগে অস্বস্তি বোধ করে এবং কাঁদতে থাকে। স্বজনেরা পরিস্থিতি খারাপ দেখে বারবার নার্সদের ডাকেন। এর মধ্যে একটি বাচ্চা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নেওয়া হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই একে একে বাকি বাচ্চাগুলোও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। শেষ মুহূর্তে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হলেও ডাক্তাররা জানান, বাচ্চারা মারা গেছে। মৃত্যুর পর কয়েকটি নবজাতকের শরীর একদম নীল বর্ণ ধারণ করেছিল বলে স্বজনেরা জোরালো অভিযোগ করেন।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাহিদ ইয়াসমিন অবশ্য ঘটনার অন্য একটি দিক সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, ওই পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে মোট ১১ জন মা এবং ৬টি নবজাতক ভর্তি ছিল। ওয়ার্ডটিতে সার্বক্ষণিক এসি চলছিল। কিন্তু গভীর রাতে মায়েরা ঠান্ডা লাগার কারণে ডিউটিরত নার্সদের এসি বন্ধ করার অনুরোধ করেন। এসি বন্ধ করার পর রাত চারটার দিকে দুটি বাচ্চা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। নার্সরা সাথে সাথে তাদের এনআইসিইউতে নিয়ে যান। সেখানে ডিউটি ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেন বাচ্চা দুটি ভালো আছে। এরপর তাদের আবার মায়ের কাছে ওয়ার্ডে ফেরত পাঠানো হয়।

অধ্যাপক নাহিদ ইয়াসমিন আরও জানান, সকালের দিকে মায়েরা আবারও বলেন যে শিশুদের খুব অসুস্থ মনে হচ্ছে। তখন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নার্সরা ছয়টি শিশুকেই তড়িঘড়ি করে এনআইসিইউতে নিয়ে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুটি শিশু পথেই মারা যায়। বাকি চারটি শিশুর অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে তাদের বাঁচাতে লাইফ সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি শিশুকেও তারা ফেরাতে পারেননি।

আমাদের দেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এনআইসিইউ খরচ সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি। একটি বেসরকারি হাসপাতালে এনআইসিইউতে এক দিন রাখতে গেলে অনেক সময় ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল গুনতে হয়। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ৮০% থেকে ৯০% মধ্যবিত্ত পরিবার এই বিপুল খরচ মেটাতে গিয়ে রীতিমতো নিঃস্ব হয়ে যায়। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষ এখানে ভরসা নিয়ে আসেন। কিন্তু এমন একটি স্বনামধন্য হাসপাতালে এক রাতে ছয়টি শিশুর মৃত্যু এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এতগুলো তাজা প্রাণ এক রাতে ঝরে যাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তারা এই ঘটনার পেছনের আসল সত্য বের করতে তিন সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি খুব শিগগিরই হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার, নার্স ও ভুক্তভোগী স্বজনদের সাথে কথা বলবে। সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন এই তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষ প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা চান, যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সামান্যতম অবহেলাও প্রমাণিত হয়, তবে দায়ীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়। নয় মাস গর্ভে ধারণ করার পর যেসব মা আজ খালি হাতে, বুকভরা কষ্ট নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন, তাদের এই শূন্যতা আর কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ