সাম্য, ত্যাগ আর মানবিকতার সুমহান বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে এই আনন্দের দিনটি উদযাপিত হয়। রোজার ঈদের মতো এই ঈদে চাঁদ দেখার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো অপেক্ষা করতে হয় না। ১০ দিন আগেই ঈদের তারিখ নিশ্চিত হয়ে যায়। তাই সাধারণ মানুষ পশু কেনা থেকে শুরু করে গ্রামের বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি একটু আগেভাগেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে সেরে নিতে পারেন। আজ ২৮ মে, বৃহস্পতিবার সারা দেশের মানুষ বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কোরবানির এই ঈদ উদযাপন করছেন।
এবার ঈদ এমন একটি সময়ে এসেছে যখন দেশের অনেক সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে বেশ চাপে রয়েছেন। কিছুদিন আগেই হাওড় অঞ্চলে অকালবন্যায় কৃষকদের বিশাল ফসলহানি হয়েছে। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে বা মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের হিসাবে টানাপোড়েন চলছে। কিন্তু শত প্রতিকূলতা আর অভাব থাকলেও বাঙালির উৎসব কখনো থেমে থাকে না। মানুষ যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনজনদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার মুহূর্তটি ঠিকই খুঁজে নেয়। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি আর যানজটের কষ্ট ভুলে লাখ লাখ মানুষ ইতিমধ্যেই শহর ছেড়ে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে গেছেন। এই ত্যাগের মধ্য দিয়ে পাওয়া মিলনের আনন্দই মূলত ঈদ উৎসবের আসল সৌন্দর্য।
ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। আজ ঈদের দিন সকালে ধনী-গরিব সবাই ভেদাভেদ ভুলে নতুন বা পরিষ্কার কাপড় পরে, গায়ে সুগন্ধি মেখে ঈদগাহ বা মসজিদে এক কাতারে গিয়ে দাঁড়াবেন। নামাজ শেষে সবাই বুকে বুক মিলিয়ে একে অপরের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দেবেন। এরপর শুরু হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পছন্দের পশু কোরবানির পালা। আমাদের দেশে সাধারণত গরু, ছাগল বা মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়। শত বছর আগে এ অঞ্চলে মানুষ সাধারণত ছাগল বা বকরি কোরবানি দিতেন। এ জন্য এই ঈদকে অনেকেই ‘বকরি ঈদ’ বলতেন। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে এ অঞ্চলে ধীরে ধীরে গরু কোরবানির প্রচলন বাড়তে থাকে।
কোরবানির পশুর মাংস বিতরণের ক্ষেত্রে ইসলাম খুব চমৎকার একটি মানবিক নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, মাংস সমান তিন ভাগ করতে হয়। যিনি কোরবানি দেন তিনি নিজে এক ভাগ রাখেন, এক ভাগ তার আত্মীয়স্বজনদের দেন এবং বাকি এক ভাগ গরিব ও অসহায় মানুষদের মাঝে বিলিয়ে দেন। সমাজে যাতে কোনো মানুষ ঈদের দিনে না খেয়ে না থাকে, তার জন্যই ইসলাম এই সাম্য ও ইনসাফের নিয়ম করেছে। কেউ হয়তো নিজের সামর্থ্যে একা একটি পশু কোরবানি দেন, আবার কেউ কয়েকজনের সাথে মিলে ভাগে কোরবানি করেন। কিন্তু দিন শেষে কোরবানির এই আনন্দ সমাজের সবার মাঝেই সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ঈদুল আজহার এই ত্যাগের পেছনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন ও শিক্ষণীয়। আল্লাহর প্রতি নিজের গভীর আনুগত্য প্রমাণ করতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ তার এই ত্যাগের মানসিকতায় খুশি হয়ে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানির নির্দেশ দেন। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির পাশাপাশি আমাদের মনের ভেতরের লোভ, হিংসা ও পশুবৃত্তিকে বিসর্জন দিতে হয়। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পশুর রক্ত বা মাংস কখনো আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, তিনি কেবল বান্দার তাকওয়া বা পরহেজগারি দেখেন।
সকালে সারা দেশে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৭টায়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে বিকল্প হিসেবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বায়তুল মোকাররমে দিনভর পর্যায়ক্রমে আরও পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকার বাইরে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দান এবং দিনাজপুরের গোরে-শহীদ ময়দানে দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতগুলো অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লাখ লাখ মানুষ একসাথে নামাজ আদায় করেন।
ঈদের আনন্দে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে সে বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর আগে থেকেই সতর্ক বার্তা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, আজ ঈদের দিন রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রামেও কিছুটা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে খুলনা ও বরিশাল বিভাগে আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত শুষ্ক থাকবে। ঈদের ছুটিতে হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নতমানের বিশেষ খাবারের আয়োজন করেছে সরকার। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীসহ বিশ্বের সব মুসলমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং সবার শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন।














