সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল, তবে আমি ছিলাম না: আসিফ মাহমুদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ কাজ করত। তবে তিনি নিজে কখনোই সেই বিশেষ ফোরামের সদস্য ছিলেন না। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সম্প্রতি ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ন্যাক্কারজনক হামলা চালায়। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করতেই এনসিপি এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ কিচেন কেবিনেট নিয়ে মুখ খোলেন। রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় সংবিধানে কিচেন কেবিনেট বলে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নেই। মূলত সরকারপ্রধান যখন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ৫ থেকে ৭ জন সহকর্মীকে নিয়ে আলাদা একটি ছোট দল তৈরি করেন এবং সব বড় সিদ্ধান্ত সেখান থেকেই নেন, তখন তাকে কিচেন কেবিনেট বলা হয়। সম্প্রতি সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন একটি বেসরকারি টিভিতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। তৌহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, সরকার চালাতে ৭ সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট খুব সক্রিয় ছিল। তাঁরা প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় বসে সব সিদ্ধান্ত নিতেন। তাদের মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে তিনি ৩ বার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি সরকার থেকে বিদায় নেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর ঠিক ৩ দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি করে সরকার। আসিফ বলেন, আমরা মনে করি এই চুক্তিটি সরাসরি বিএনপিই করেছে। তাদের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে দিয়ে নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তারা শুধু রাজনৈতিক দোষারোপের খেলা খেলছে।

চুক্তির বিষয়ে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৪ মার্চ দাবি করেছিলেন যে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি নিয়েই তারা চুক্তিটি করেছিলেন। কিন্তু তার এই দাবি পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ১৫ মে রংপুরের এক অনুষ্ঠানে সাফ জানিয়ে দেন, চুক্তির বিষয়ে কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলেনি। এবার আসিফ মাহমুদও একই সুরে কথা বললেন। তিনি বলেন, এনসিপির আহ্বায়ক থেকে শুরু করে কারও সাথেই কেউ এই চুক্তি নিয়ে বিন্দুমাত্র আলোচনা করেনি। আসিফ বর্তমান সরকারের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, যদি আপনাদের সৎ সাহস থাকে, তবে চুক্তিটি বাতিল করুন বা দেশের স্বার্থে নতুন করে আলোচনা করুন। শুধু শুধু ব্লেম গেমের রাজনীতি করে মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করবেন না।

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর হাট নিয়ে সারা দেশে যে নৈরাজ্য চলছে, তা নিয়েও আসিফ মাহমুদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এবার দেশের প্রায় ১০০% পশুর হাটের ইজারা পেয়েছে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। যারা ইজারা পায়নি, তারাও জোর করে পাড়ায় পাড়ায় অবৈধ হাট বসাচ্ছে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক হাসিল আদায় করছে। পশুর হাটের এই ব্যবসায় প্রতিদিন মিলিয়ন $ (ডলার) বা কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা এখন পুরোপুরি সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেছে। যানজট মুক্ত রাখার জন্য তৈরি করা আধুনিক মেট্রোস্টেশনের নিচেও তারা পশুর হাট বসিয়েছে। পুরো ব্যবস্থাটি এখন একটি দলের স্থানীয় নেতাদের পকেটে চলে গেছে। এর পাশাপাশি ঈদযাত্রায় সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে বাসে ও লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।

দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান অবস্থা নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেন সাবেক এই ক্রীড়া উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিসিবিতে এখন পুরোপুরি পরিবারতন্ত্র চলছে। দেখে মনে হচ্ছে আমরা একটি রাজতন্ত্রে বসবাস করছি। অথচ ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তারা ক্রীড়াঙ্গনে কোনো দলীয়করণ করবেন না। তারা আসলে সত্যি কথাই বলেছিলেন, কারণ তারা দলীয়করণের বদলে এখন সরাসরি পরিবারকরণ করেছেন। ভয়ে কেউ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না।

সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বক্তব্য রাখেন। শৈলকুপায় তার ওপর হওয়া হামলার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তারা। অনুষ্ঠানে দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ও এস এম সাইফ মোস্তাফিজসহ আরও অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই বর্তমান সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার থাকার ঘোষণা দেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ