সারাদেশে একের পর এক নারী ধর্ষণ, খুন ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের পর্দা খুললেই এমন দুঃসংবাদ চোখে পড়ে। দেশের আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া এসব নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে এবার উত্তাল হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এলাকার সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। আজ শুক্রবার সকালে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা চত্বরে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও শিক্ষার্থীরা।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৫% অভিভাবক তাদের মেয়ে শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন পার করেন। ঘর থেকে বের হলে নারীরা ১০০% নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, সেই নিশ্চয়তা আজ যেন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বাঞ্ছারামপুরের এই বিক্ষোভ সমাবেশে সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তারা আর এই অন্যায় নীরবে মেনে নেবেন না।
শুক্রবার সকাল থেকেই বাঞ্ছারামপুর উপজেলা চত্বরে মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী শিশু, কিশোর ও বয়স্কদের হাতে ছিল নানা ধরনের প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন। এসব প্ল্যাকার্ডে ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’, ‘শিশুদের জন্য নিরাপদ দেশ চাই’, ‘নারী নির্যাতন বন্ধ করো’ এমন অসংখ্য স্লোগান লেখা ছিল। রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে শত শত মানুষের কণ্ঠে এসব স্লোগান চারপাশের পরিবেশকে প্রকম্পিত করে তোলে। পুরো কর্মসূচির সার্বিক পরিচালনা করেন বাঞ্ছারামপুর উপজেলা সমন্বয়ক মো. শামীম শিবলী। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এলাকার যুবসমাজ এই আন্দোলনে দারুণভাবে সাড়া দেয়।
সমাবেশে দাঁড়িয়ে মো. শামীম শিবলী অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে নারী ও শিশুদের ওপর যে হারে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটছে, তা পুরো জাতিকে গভীরভাবে লজ্জিত ও উদ্বিগ্ন করেছে। কোমলমতি শিশুদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। এই কাজ শুধু একা সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—এই তিন শক্তিকে এক হয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন ছাত্র-জনতা এক কাতার, তখন নিশ্চিত হবেই সুবিচার।” তাঁর এই কথার সাথে উপস্থিত হাজারো জনতা হাত তুলে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
বক্তারা দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, একটি নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ মামলার বিচারকাজ শেষ হতে অনেক সময় বছরের পর বছর লেগে যায়। আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে গিয়ে অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, একটি সাধারণ পরিবারকে মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে ১,০০০
থেকে২,০০০(ডলার) বা লাখ লাখ টাকা ধারদেনা করতে হয়। বিচার পেতে দেরি হওয়ার কারণেই মূলত অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পায়। তাই বক্তারা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে এসব জঘন্য অপরাধের বিচার শেষ করার জোর দাবি জানান।
মানববন্ধনে উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থীরাও তাদের ক্ষোভের কথা অকপটে জানান। তারা বলেন, নারীদের ওপর সহিংসতা ও রাস্তাঘাটে হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই প্রতিবাদ কোনোভাবেই থামবে না। সমাজকে বদলাতে হলে সবার আগে মানুষের মানসিকতা বদলাতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবারে নারীদের সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো সমাজেই অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা হুশিয়ার করে বলেন, প্রশাসন যদি অপরাধীদের ধরতে টালবাহানা করে, তবে তারা আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচি হাতে নেবেন।
মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা উপজেলা চত্বর এলাকায় একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। সাধারণ পথচারী ও বাজারের ব্যবসায়ীরাও তাদের এই দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। বাঞ্ছারামপুরের এই প্রতিবাদী জনতা আজ দেশের প্রতিটি মানুষের মনের কথাই যেন রাজপথে দাঁড়িয়ে বলেছেন। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে হলে এমন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।














