মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরার আশা যেন বারবার হোঁচট খাচ্ছে। কাতারে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই ইরানের হরমুজ প্রণালির কাছে কয়েক দফা বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা করতে কাতারে পৌঁছেছে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল, অন্যদিকে এই বিমান হামলার কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু এই নতুন হামলার ঘটনা সেই যুদ্ধবিরতিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে তারা দাবি করেছে যে, এটি সম্পূর্ণ ‘আত্মরক্ষামূলক’ একটি পদক্ষেপ। সোমবার রাতের শেষ ভাগে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকমের মুখপাত্র নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানি বাহিনীর হুমকি রুখতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার মূল নিশানায় ছিল ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র এবং সাগরে মাইন বসানোর চেষ্টায় থাকা কয়েকটি ইরানি নৌকা। সেন্টকম নির্দিষ্ট স্থানের নাম না জানালেও, ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাসে বিকট বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এই হামলার পেছনে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কারণ বেশ স্পষ্ট। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে ভারত সফরে রয়েছেন। ভারতের জয়পুরে বসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বের জ্বালানি চলাচলের অন্যতম প্রধান এই পথটি এখন ইরানের অঘোষিত অবরোধের মুখে রয়েছে। যেকোনো মূল্যে এই হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে। উল্লেখ্য, স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০% এই প্রণালি দিয়ে পারাপার হয়। এই পথ বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়বে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে জ্বালানি কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করতে হবে, যা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সবার জন্য একটি লাভজনক ও দারুণ চুক্তি হতে হবে, তা না হলে কোনো চুক্তিই হবে না। আলোচনা ব্যর্থ হলে ট্রাম্প আগের চেয়ে আরও বড় ও শক্তিশালী হামলার হুমকি দিয়েছেন। শান্তি চুক্তির শর্ত হিসেবে ট্রাম্প চাইছেন সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো যেন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ‘আব্রাহাম চুক্তিতে’ সই করে। তবে আরব দেশগুলো জানিয়েছে, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই কেবল তারা ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করবে।
মার্কিন এই হামলার কড়া জবাব দিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং একটি যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে। এছাড়া তারা একটি আধুনিক স্টিলথ ড্রোনও ভূপাতিত করার দাবি করেছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সম্পূর্ণ বৈধ অধিকার ইরানের রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনিও কড়া ভাষায় মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন। হজ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আর মার্কিন ঘাঁটির ঢাল হিসেবে কাজ করবে না এবং অশুভ শক্তির জন্য এই অঞ্চলে কোনো নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না।
কূটনীতির মাঠেও এখন চরম উত্তেজনা ও ব্যস্ততা বিরাজ করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোল নাসের হেমমাতির মতো শীর্ষ নেতারা এখন দোহায় অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, চার দিনের সফরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীনে অবস্থান করছেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে রাজি করাতে চীন যেন বড় ভূমিকা রাখে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন আগে থেকেই চাপ দিয়ে আসছিল। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, তারা আলোচনার অনেক বিষয়ে একমত হলেও খুব শিগগিরই কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হচ্ছে না। আপাতত তাদের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধ থামানো।
এই পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আল-জাজিরার বিশ্লেষক অ্যালান ফিশার ওয়াশিংটন থেকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প এই মুহূর্তে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে বেশ উদগ্রীব। কিন্তু এই ধরনের ছোটখাটো হামলা ও সংঘর্ষ চলমান শান্তি আলোচনাকে যেকোনো মুহূর্তে লাইনচ্যুত করতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির কর্মসংস্থানও চরম হুমকির মুখে পড়বে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই পুরো বিশ্ব এখন দোহায় চলমান এই শান্তি আলোচনার দিকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তাকিয়ে আছে।














