চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি এখন প্রশাসনের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্গম এলাকার সন্ত্রাসীদের দমন করতে এবং প্রশাসনিক নজরদারি বাড়াতে জেলা প্রশাসন এখন জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত ২ এপ্রিল তারা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ৩টি সংযোগ সড়ক দ্রুত পাকা করার জন্য ১৬ কোটি টাকা বা প্রায় ১.৪ মিলিয়ন $ বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। রাস্তার এই উন্নয়ন কাজটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডকে দিয়ে করানোর প্রস্তাব দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
প্রশাসন চায় সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে এই টাকার বরাদ্দ আসুক। এরপর অর্পিত ক্রয়কাজ বা ডিপিএম পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীর এই বিশেষ ব্রিগেড সড়কগুলো নির্মাণ করবে। সাধারণত কোনো কাজ করার সামর্থ্য নিজস্ব বিভাগের না থাকলে অভিজ্ঞ কোনো সংস্থাকে দিয়ে সেটি করানো হয়, যাকে ডিপিএম পদ্ধতি বলে। জঙ্গল সলিমপুরের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর বিশাল পাহাড়ি এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই মূলত এই উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের এই পাহাড়ি এলাকাটি খুবই দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই পুরো এলাকা দখল করে রেখেছিল। তারা সেখানে পাহাড় কাটা থেকে শুরু করে নানা ধরনের মারাত্মক অপরাধ চালাত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে কোনো অভিযান চালাতে গেলেই সন্ত্রাসীরা নারী ও শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। চলতি বছরের গত ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল সেখানে অস্ত্র উদ্ধার করতে যায়। তখন সন্ত্রাসীরা সরাসরি গুলি চালায়। ওই হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া প্রাণ হারান এবং আরও ৩ জন সদস্য গুরুতর আহত হন।
র্যাব কর্মকর্তার মৃত্যুর পর প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে যায়। গত ৯ মার্চ ভোর ৬টায় প্রশাসন সেখানে এক বিশাল যৌথ অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রায় ৪ হাজার সদস্য এই অভিযানে সরাসরি অংশ নেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর তারা জায়গাটি দখলমুক্ত করেন এবং নিরাপত্তার জন্য সেখানে যৌথ বাহিনীর ২টি ক্যাম্প স্থাপন করেন। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি শান্ত হয়নি। গতকাল রোববার গভীর রাতে আলীনগর এলাকায় সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে র্যাবের ক্যাম্পে গুলি চালায়। তারা বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়াল ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি যেন ঢুকতে না পারে, সে জন্য তারা অন্তত ৩টি জায়গায় রাস্তা কেটে চলাচলের অযোগ্য করে দিয়েছে।
এই সন্ত্রাসী হামলার পরই ওই এলাকায় পাকা সড়ক নির্মাণের গুরুত্ব সবার কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এবং ভালো কোনো রাস্তাঘাট না থাকায় সেখানে স্থাপিত ক্যাম্পে খাবার, পানি, রসদ ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পের সদস্যদের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ করতে এই ৩টি সংযোগ সড়ক দ্রুত পাকা করা ছাড়া আপাতত কোনো বিকল্প নেই।
জেলা প্রশাসনের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ৩টি সড়কের মোট দৈর্ঘ্য সোয়া ছয় কিলোমিটার। পুরো কাজ শেষ করতে মোট ১৬ কোটি টাকার ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো বায়েজিদ লিংক রোড থেকে কালা পানিয়া বেতুয়া সড়ক হয়ে হাটহাজারী বাজার লিংক সড়ক পর্যন্ত উন্নয়ন কাজ। শুধু এই সড়কেই খরচ হবে প্রায় ৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া জলিল টেক্সটাইল থেকে আলীনগর প্রাইমারি অ্যান্ড হাইস্কুল সড়কটি পাকা করতে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকা লাগবে। আর ছিন্নমূল বিদ্যুৎ অফিস থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এম আর চৌধুরী ফায়ারিং রেঞ্জ সড়কটি ঠিক করতে প্রশাসন ৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরছে।
সড়ক নির্মাণের এই বিশাল উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা গণমাধ্যমকে নিজের মতামত জানিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই ৩টি সড়ক পাকা হলে প্রশাসনের জন্য অনেক সুবিধা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুব সহজেই সন্ত্রাসীদের যেকোনো আস্তানায় দ্রুত অভিযান চালাতে পারবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়বে এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় এক বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।














