রবিবার সকাল বেলা মানুষের ব্যস্ততা যখন সবে শুরু হচ্ছে, ঠিক তখনই ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে ঘটে গেল এক বড় রেল দুর্ঘটনা। সকাল ৬টার দিকে কোটচাঁদপুর উপজেলার সাফদারপুর রেলস্টেশনের কাছে একটি মালবাহী ট্রেনের তিনটি বগি হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। এই একটি মাত্র দুর্ঘটনার কারণে মুহূর্তের মধ্যেই খুলনার সঙ্গে ঢাকা ও সারা দেশের রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভোরের আলো ফোটার পরপরই এমন ঘটনায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার সাধারণ যাত্রী।
স্থানীয় লোকজন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, পণ্যবোঝাই ওই মালবাহী ট্রেনটি খুলনা থেকে ছেড়ে এসে নিজের গন্তব্যে যাচ্ছিল। ট্রেনটি সাফদারপুর এলাকায় পৌঁছালে বিকট শব্দ করে এর তিনটি ভারী বগি রেললাইন থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যায়। বগিগুলো লাইনচ্যুত হওয়ার কারণে রেললাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। লোহার ভারী চাকায় স্লিপার ও পাথরগুলো দুমড়েমুচড়ে গেছে। তবে এই বিশাল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, ট্রেনটি মালবাহী হওয়ায় এবং আশপাশে মানুষ না থাকায় কেউ হতাহত বা গুরুতর আহত হননি।
এই দুর্ঘটনার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। খুলনা থেকে ঢাকা, রাজশাহী বা উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়া সব কটি যাত্রীবাহী ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়েছে। আবার ঢাকা থেকে খুলনার দিকে আসা ট্রেনগুলোও মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনে আটকা পড়া প্রায় ৮০% যাত্রী হঠাৎ ট্রেন বন্ধ হওয়ায় রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। শিশু ও বয়স্ক মানুষদের নিয়ে তারা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। বাধ্য হয়ে অনেকেই বেশি ভাড়া গুনে বাসের টিকিট কেটে নিজেদের গন্তব্যের দিকে রওনা দিচ্ছেন।
শুধু যাত্রীদের কষ্টই নয়, মালবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় দেশের অর্থনীতিতেও এর একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খুলনা ও মোংলা বন্দর থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য রেলে করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি বন্ধ থাকায় তাদের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা একেবারে থমকে গেছে। হিসাব করলে দেখা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এক দিনেই পরিবহন ও ব্যবসা খাতে অন্তত ৫০,০০০থেকে১০০,০০০(ডলার) সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। কারণ অনেক জরুরি কাঁচামাল ও পণ্য সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই রেলওয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা একটুও দেরি না করে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেন। লাইনচ্যুত ভারী বগিগুলো সরানোর জন্য ঈশ্বরদী জংশন থেকে একটি শক্তিশালী উদ্ধারকারী বা রিলিফ ট্রেনকে তলব করা হয়েছে। উদ্ধারকারী ট্রেনটি দ্রুতগতিতে কোটচাঁদপুরের দিকে এগিয়ে আসছে। রেলকর্মীরাও নিজেদের সব যন্ত্রপাতি নিয়ে লাইনের পাশে প্রস্তুত আছেন। রিলিফ ট্রেনটি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই লাইন ক্লিয়ার করার মূল কাজ শুরু করবেন তারা।
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন যে, দুর্ঘটনাস্থলে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। তবে রেললাইনের ক্ষতি অনেক বেশি হওয়ায় বগিগুলো উদ্ধার করে লাইন পুরোপুরি মেরামত করতে ঠিক কত ঘণ্টা সময় লাগবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা খুব কঠিন। লাইনচ্যুত বগিগুলো সরানোর পর ক্ষতিগ্রস্ত স্লিপার ও রেললাইন পাল্টাতে বেশ অনেকটা সময় লেগে যাবে। পরিস্থিতি ১০০% স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই রুটে ট্রেন চলাচল শুরু করার কোনো সুযোগ নেই।
মালবাহী ট্রেনটি ঠিক কী কারণে হঠাৎ লাইনচ্যুত হলো, তার আসল কারণ খুঁজতে রেলওয়ে প্রশাসন একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করার কাজ শুরু করেছে। রেললাইন অনেক পুরোনো হওয়ার কারণে নাকি ট্রেনের চাকার যান্ত্রিক কোনো ত্রুটির কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তা ওই তদন্তের পর পরিষ্কারভাবে বেরিয়ে আসবে। আপাতত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের একটু ধৈর্য ধরার অনুরোধ করেছেন। কর্মীরা নিরলস পরিশ্রম করে খুব দ্রুতই সারা দেশের সাথে খুলনার রেল যোগাযোগ আবার স্বাভাবিক করবেন বলে তারা কথা দিয়েছেন।














