চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মাদকের ভয়াবহতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এই জেলায় সহজেই মাদক প্রবেশ করছে এবং তরুণ সমাজ এর শিকার হচ্ছে। তবে এই মাদকের বিস্তার রোধ করতে এবং যুবসমাজকে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচাতে স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
রোববার, ৭ জুন ২০২৬ তারিখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি বিশেষ আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করে। ওইদিন বিকেল ৪টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানাধীন প্রান্তিকপাড়া বা রেলবস্তি এলাকায় এই সফল অভিযানটি চালানো হয়।
গোপন সূত্রে জানা যায়, প্রান্তিকপাড়া এলাকায় একজন পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে তার অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। খবর পেয়ে ডিএনসির বিশেষ দল দ্রুত সেখানে পৌঁছায় এবং অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের সময় তারা মোঃ হাসান তারেক ওরফে পাতান (৪১) নামের এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারের পর তার দেহ তল্লাশি করে ২০ পিস অবৈধ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। ইয়াবা একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং আসক্তি সৃষ্টিকারী মাদক। এটি মূলত মিথাইলঅ্যামফিটামিন এবং ক্যাফেইনের একটি মিশ্রণ। দীর্ঘমেয়াদে ইয়াবা সেবনের ফলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে স্মৃতিভ্রম, হতাশা, উদ্বেগ এবং এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত হাসান তারেক ওরফে পাতান কোনো সাধারণ অপরাধী নয়; সে একজন পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী। সে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে খুব গোপনে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। এর আগেও তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে ডিএনসি নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত বছরও তাকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল।
এই ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মোঃ রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে গ্রেফতারকৃত আসামির বিরুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এই ধরনের মামলা সাধারণত খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয় এবং আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জেলায় মাদকের বিস্তার রোধ, যুবসমাজকে রক্ষা এবং মাদক কারবারিদের সম্পূর্ণ নির্মূল করতে চলমান এই বিশেষ আভিযানিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও আরও জোরদার ও গতিশীলভাবে অব্যাহত থাকবে। তারা মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদকের এই বিস্তার কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সমস্যা। সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে ঢুকছে কোটি কোটি টাকার মাদক। এতে একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি তরুণ সমাজও ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে।
এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। পুলিশ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।
সর্বোপরি, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তরুণ সমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত করতে হবে এবং তাদের সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে উৎসাহিত করতে হবে। তবেই হয়তো এই মরণ নেশার হাত থেকে আমাদের সমাজ এবং দেশ রক্ষা পাবে।














